ইসলামী ভ্রাতৃত্ববোধের দাবী

ভ্রাতৃত্ববোধের মর্ম হচ্ছে, রক্তের সূত্রে ভাই নন এমন ব্যক্তির সাথেও ভাইসুলভ আচরণ করা। এক ভাই অপর ভাইয়ের প্রতি যেমন কল্যাণকামী হয়, তাদের পারস্পরিক সম্পর্কে থাকে শ্রদ্ধাবোধ ও ভালোবাসা, এবং যেখানে কোনো প্রতারণা ও শঠতা থাকে না—ভ্রাতৃত্ববোধ বলতে মূলত এমন উন্নত আচরণকে বোঝানো হয়। অন্যান্য সুন্দর আখলাকের মতো একেও ধারণ করার নির্দেশ ইসলাম দিয়েছে। বস্তুত মুসলিমদের পারস্পরিক আচরণ ও লেনদেন নির্মিত হবে ভ্রাতৃত্ববোধের ওপর, এটি কুরআন-হাদীসের মৌলিক শিক্ষা। তাছাড়া কুরআনে কারীম ভ্রাতৃত্ববোধকে আল্লাহ তাআলার বিশেষ নিয়ামত হিসেবে অভিহিত করেছে।

সূরা আলে ইমরানে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন,

وَاذْكُرُوا نِعْمَتَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ إِذْ
كُنْتُمْ أَعْدَاءً فَأَلَّفَ بَيْنَ قُلُوبِكُمْ فَأَصْبَحْتُمْ بِنِعْمَتِهِ
إِخْوَانًا

“তোমরা স্মরণ করো তোমাদের ওপর আল্লাহর অনুগ্রহের কথা, যখন তোমরা ছিলে পরস্পর শত্রু। তারপর আল্লাহ তোমাদের মাঝে হৃদ্যতা সৃষ্টি করে দিলেন। ফলে তোমরা তাঁর অনুগ্রহে ভাই ভাই হয়ে গেলে।” (সূরা আলে ইমরান, আয়াত ১০৩)

আউস ও খাযরাজ ছিল মদীনা মুনাওয়ারার প্রধান দুই গোত্র। ইসলামপূর্ব সময়ে তাদের মাঝে দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ চলমান ছিল। একে অন্যের প্রতি তারা ছিল চরম শত্রুভাবাপন্ন। টুকরো হয়ে যাওয়া বন্ধন নতুন করে জোড়া লাগবে বা তারা একে অন্যের কাছাকাছি আসবে, এমন কোনো সম্ভাবনাই ছিল না। কিন্তু আল্লাহ তাআলা ইসলামের বন্ধন তৈরি করে দুটি গোত্রকে এক কাতারে এনে দাঁড় করিয়েছিলেন। তাদের মধ্যকার সম্পর্ক এতটাই গভীর ও জোরালো হয়েছিল, যা কেবল সহোদর ভাইদের মাঝেই কল্পনা করা যায়। আয়াতে ঐতিহাসিক এই বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে এবং বলা হয়েছে, তাদের মধ্যকার এই ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক মূলত আল্লাহ তাআলার বিশেষ অনুগ্রহের প্রকাশ ও ফলাফল।

কুরআন ও হাদীসে ভ্রাতৃত্ববোধ

কুরআন ও হাদীসের সামগ্রিক শিক্ষার দিকে তাকালে বোঝা যায়, ভ্রাতৃত্ববোধ আল্লাহ প্রদত্ত শুধু একটি ভালো গুণ ও অনুগ্রহই নয়, বরং এটি ইসলামের অত্যন্ত জরুরী একটি নির্দেশনাও বটে। সূরা হুজুরাতে বলা হয়েছে:

إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ

“মুমিনরা তো পরস্পর ভাই।” (সূরা হুজুরাত, আয়াত ১০) এখানে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনকে মুমিনদের জরুরী বৈশিষ্ট্য হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। ফলে প্রকৃত মুমিন হয়ে উঠার জন্য ভ্রাতৃত্ববোধ থাকা জরুরী। হাদীসে একটি সুন্দর উদাহরণ টেনে ভ্রাতৃত্ববোধকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

تَرَى المُؤْمِنِينَ فِي تَرَاحُمِهِمْ وَتَوَادِّهِمْ
وَتَعَاطُفِهِمْ كمَثَلُ الْجَسَدِ، إِذَا اشْتَكَى مِنْهُ عُضْوٌ تَدَاعَى لَهُ
سَائِرُ الْجَسَدِ بِالسَّهَرِ وَالْحُمَّى.

“পারস্পরিক দয়া, অনুগ্রহ ও ভালোবাসার ক্ষেত্রে তুমি মুমিনদের দেখতে পাবে তারা একটি দেহের মতো। দেহের একটি অঙ্গ পীড়িত হলে অন্যান্য অঙ্গগুলোও আক্রান্ত হয়। সেই অঙ্গটির ন্যায় তারাও বিনিদ্র রজনী কাটায় এবং ব্যথা-যন্ত্রণা সহ্য করে।” (সহীহ বুখারী, হাদীস ৬০১১) অন্য একটি হাদীসে মুমিনদের তুলনা করা হয়েছে শক্ত এক স্থাপনার সঙ্গে। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

الْمُؤْمِنُ لِلْمُؤْمِنِ كَالْبُنْيَانِ
يَشُدُّ بَعْضُهُ بَعْضًا

“মুমিন মুমিনের জন্য স্থাপনা সদৃশ। স্থাপনার এক অংশ অন্য অংশকে শক্তি জোগায় (অর্থাৎ, এক মুমিন অপর মুমিনকে শক্তি জোগাবে এবং সুখে-দুঃখে পাশে থাকবে।)
(সহীহ বুখারী, হাদীস ২৪৪৬)

বস্তুত ইসলাম মানবজাতির জন্য যে শিক্ষা ও দর্শন পেশ করেছে, তাতে আত্মকেন্দ্রিক একক জীবন যাপনের কোনো সুযোগ নেই। ঐক্য ও সমাজবদ্ধতা ছাড়া ইসলামি জীবন কল্পনা করা যায় না। জামাতে নামাজ আদায়, জুমআ ও ঈদের জামাত, হজ, জিহাদসহ বহু বিধান এমন রয়েছে, যেগুলো একা একা পালন করার সুযোগই নেই। আর ভ্রাতৃত্ববোধ ছাড়া কাঙ্ক্ষিত এই যুথবদ্ধতা কিছুতেই তৈরি হওয়া সম্ভব নয়।

দুঃখজনক বাস্তবতা ও একটি ভুল সিদ্ধান্তের দায়

কিন্তু বাস্তবতায় আমরা যা দেখি তা এক ভিন্ন চিত্র। এই ইসলামী শিক্ষার প্রতিফলন আমাদের যাপিত জীবনে দেখা যায় না। এক মুসলিম অন্য মুসলিমকে ভাই হিসেবে গ্রহণ করার পথে তৈরি করে অসংখ্য অন্তরায়। সে কি আমার বংশের? একই ভাষাভাষী? একই অঞ্চল বা দেশের? গায়ের বর্ণ কি একই রকম? এমনতর নানা প্রশ্ন তোলা হয় এবং এসব ক্ষেত্রে বৈশাদৃশ্য দেখা গেলে সেই ব্যক্তির সাথে ভাইসুলভ আচরণ করা হয় না।

এর পেছনে দায়ী হচ্ছে একটি ভুল চিন্তা ও সিদ্ধান্ত। মানুষ ব্যাপকভাবে এই মনোভাব লালন করে থাকে যে—বংশ, ভাষা, বর্ণ বা ভূখণ্ডের কারণে কোনো ব্যক্তি শ্রেষ্ঠ হয়। এসবকে তারা গ্রহণ করেছে শ্রেষ্ঠত্বের মানদণ্ড হিসেবে। যে ইংরেজি ভাষাভাষী, সে নিজের ভাষাকে অন্যান্য ভাষার তুলনায় শ্রেষ্ঠ মনে করছে। আবার রুশ নাগরিক রুশ হওয়ার কারণে নিজেকে যেকোনো চৈনিক থেকে শ্রেষ্ঠ জ্ঞান করছে। শ্বেতাঙ্গ নিজেকে কৃষ্ণাঙ্গের চেয়ে বেশি মর্যাদাবান ভাবছে, আবার কৃষ্ণাঙ্গও নিজেকে শ্বেতাঙ্গের চেয়ে উত্তম মনে করছে। এই শ্রেষ্ঠত্বের ভুল ধারণা থেকে তৈরি হয় অহংবোধ ও জাত্যাভিমান। যার অনিবার্য পরিণতি হলো—যে তার ভাষাভাষী, বর্ণ বা দেশের নয়, তাকে তুচ্ছ ও হেয় মনে করা। ফলে মানুষ ভ্রাতৃত্বের যে দাবী আছে, তা পুরোপুরি পূরণ করতে ব্যর্থ হয়।

কিন্তু আল্লাহ তাআলা এই কৃত্রিম মানদণ্ডকে সম্পূর্ণ বাতিল করেছেন। মানুষের ভাষা, বংশ, গোত্র ও দেশে আল্লাহ তাআলা কেন বৈচিত্র্য সৃষ্টি করেছেন, তাও স্পষ্ট করে দিয়েছেন। জানিয়ে দিয়েছেন, এগুলো কারো শ্রেষ্ঠ হওয়া বা অধম হওয়ার মাপকাঠি নয় কোনোভাবেই। সূরা হুজুরাতে তিনি বলেন:

يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّا خَلَقْنَاكُمْ
مِنْ ذَكَرٍ وَأُنْثَى وَجَعَلْنَاكُمْ شُعُوبًا وَقَبَائِلَ لِتَعَارَفُوا إِنَّ
أَكْرَمَكُمْ عِنْدَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ

“হে মানবসম্প্রদায়, আমি একজন পুরুষ ও একজন নারী থেকে তোমাদের সৃষ্টি করেছি। আর বিভক্ত করেছি তোমাদের বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যেন তোমরা পরস্পরকে চিনতে পারো। নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট তোমাদের মাঝে সবচেয়ে সম্মানিত সে, যে সবচেয়ে বেশি তাকওয়ার অধিকারী।” (সূরা হুজুরাত, আয়াত ১৩)

চাইলে পৃথিবীর সকল মানুষকে আল্লাহ তাআলা এক আকৃতি, বর্ণ, ভাষা ও গঠনে সৃষ্টি করতে পারতেন। কিন্তু তাতে বৈচিত্র্য থাকত না, ক্ষেত্রবিশেষে মানুষ একে অন্যকে সহজে চিনতেও পারত না। বোঝা যাচ্ছে, এক মহান হেকমতকে সামনে রেখেই তিনি এই বৈচিত্র্য তৈরি করেছেন। তবে এই বৈচিত্র্যকে শ্রেষ্ঠত্বের মানদণ্ড বিবেচনা করার কোনো সুযোগ নেই। মানুষ হিসেবে সবাই সমান, সকলের স্তর এক। মানুষের মাঝে তারাই মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করবে, যাদের মাঝে আছে ‘তাকওয়া’—অর্থাৎ খোদাভীতি এবং আল্লাহর আদেশ-নিষেধ মেনে চলার গুণ। আয়াতের মূল শিক্ষা এটাই।

হাদীসের ভাষ্যও ঠিক এমনই। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিদায় হজের ঐতিহাসিক মুহূর্তে ঘোষণা করেছেন,

أَلَا لَا فَضْلَ لِعَرَبِيٍّ عَلَى عَجَمِيٍّ، وَلَا
لِعَجَمِيٍّ عَلَى عَرَبِيٍّ، وَلَا أَحْمَرَ عَلَى أَسْوَدَ، وَلَا أَسْوَدَ عَلَى
أَحْمَرَ إِلَّا بِالتَّقْوَى

“জেনে রেখো! কোনো আরবের মর্যাদা নেই অনারবের ওপর, কোনো অনারবেরও আরবের ওপর মর্যাদা নেই। শ্বেতাঙ্গ কৃষ্ণাঙ্গের চেয়ে শ্রেষ্ঠ নয়, কৃষ্ণাঙ্গও শ্বেতাঙ্গের চেয়ে শ্রেষ্ঠ নয়; মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব নিরূপণ করা হবে শুধু খোদাভীতি দিয়ে।” (মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ২২৯৭৮)

আর এই তাকওয়া বা খোদাভীতি সম্পূর্ণ অভ্যন্তরীণ একটি বিষয়, যা বাইরে থেকে দৃশ্যমান নয়। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের বুকের দিকে ইশারা করে তিনবার বলেছিলেন,

التَّقْوَى هَاهُنَا

“তাকওয়া এখানে।” (সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৫৬৪)

ফলে বাহ্যিক ও সাধারণ বিবেচনায় সকল মুসলিম সমান। কাউকে উল্লেখিত মানদণ্ড—ভাষা, গোত্র, বংশ, দেশ কিংবা বর্ণের কারণে শ্রেষ্ঠ বা অধম মনে করার কোনো বৈধতা নেই।

মুসলিম হলেই তার সাথে ভাইসুলভ আচরণ করতে হবে, এটিই ইসলামের সাধারণ শিক্ষা—সে যে দেশ, ভাষা, বর্ণ বা গোত্রেরই হোক না কেন।

এই অনুপম শিক্ষার কারণেই আমরা ইতিহাসে দেখেছি—পারসিক সাহাবী হযরত সালমান ফারসী, হাবশী সাহাবী হযরত বিলাল, রোমক সাহাবী হযরত সুহাইবসহ ভিনদেশের অনেক মানুষ আরবী মুসলমানদের মাঝে সর্বোচ্চ সম্মান ও মর্যাদা নিয়ে বসবাস করেছেন। মক্কা থেকে আসা মুহাজির সাহাবীগণ মদীনার আনসারী সাহাবীদের আপন ভাই হয়ে উঠেছেন। আনসারী সাহাবীগণও মুহাজিরদের প্রতি ভালোবাসা ও আন্তরিকতা উজাড় করে দিয়েছেন। কৃতদাস ও আযাদকৃত দাসরাও পরবর্তী সময়ে বড় বড় শিক্ষক হয়েছেন, এমনকি অনেকে বিচারকের পদ পর্যন্ত অলংকৃত করেছেন।

এসবই সম্ভব হয়েছে ভ্রাতৃত্ববোধের অনন্য শিক্ষার কল্যাণে।

ভ্রাতৃত্ববোধের দাবী ও নিদর্শন

পবিত্র কুরআন ও হাদীসে ভ্রাতৃত্ববোধের বেশ কিছু দাবী বর্ণনা করা হয়েছে। এক মুসলিম অন্য মুসলিমকে ভাই মনে করার জন্য তার মাঝে কী কী বিষয় থাকা চাই, এর বিশদ বিবরণ এসেছে। এক হাদীসে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:

الْمُسْلِمُ أَخُو الْمُسْلِمِ لَا يَظْلِمُهُ
وَلَا يُسْلِمُهُ

“এক মুসলিম অপর মুসলিমের ভাই। সে তার ওপর জুলুম করবে না এবং শত্রুর হাতে তাকে অর্পণ করবে না।” (সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৫৮০)

প্রথম দাবী—সে তার ওপর জুলুম করবে না:

অর্থাৎ অন্যায় ও অবিচারের যত রূপ ও ধরন হতে পারে, সব থেকে বিরত থাকবে। মুসলিম ভাইয়ের আর্থিক ক্ষতি, শরীরে আঘাত, সম্মানহানি কিংবা কোনো ধরনের হক নষ্ট করাসহ যাবতীয় জুলুম থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখবে।

দ্বিতীয় দাবী—সে তাকে শত্রুর হাতে অর্পণ করবে না:

কোনো মুসলিম বিপদে পড়লে, কিংবা শত্রু ও ছিনতাইকারীর কবলে পড়লে ভ্রাতৃত্বের দাবী হচ্ছে সর্বোচ্চ চেষ্টা করে তাকে উদ্ধার করা। শত্রুর হাতে তাকে সোপর্দ করে গা বাঁচানো কিংবা ‘এটা তার ব্যক্তিগত ব্যাপার’ বলে এড়িয়ে যাওয়া ইসলামি স্বভাব-চরিত্রের পরিপন্থী। অন্য একটি হাদীসে আরও ব্যাপক শব্দ এসেছে—”সে তাকে সাহায্যহারা করবে না।” যার মর্ম হচ্ছে, যেকোনো মুহূর্তে যদি মুসলিম ভাইয়ের সাহায্যের দরকার পড়ে, তবে ভ্রাতৃত্ববোধের দাবী হলো সামর্থ্য মাফিক তার পাশে দাঁড়ানো।

ভ্রাতৃত্ববোধের দাবী পূরণে কেউ যখন অপরের পাশে দাঁড়াবে, তখন তার মহৎ প্রাপ্তি কী? সহীহ মুসলিমে বর্ণিত উক্ত হাদীসেই বলা হয়েছে:

وَمَنْ كَانَ فِي حَاجَةِ أَخِيهِ كَانَ اللَّهُ
فِي حَاجَتِهِ وَمَنْ فَرَّجَ عَنْ مُسْلِمٍ كُرْبَةً فَرَّجَ اللَّهُ عَنْهُ
كُرْبَةً مِنْ كُرُبَاتِ يَوْمِ الْقِيَامَةِ

“যে তার ভাইয়ের প্রয়োজনে পাশে থাকবে, আল্লাহ তার প্রয়োজনে সাহায্য করবেন। এবং যে ব্যক্তি কোনো মুসলিমের একটি বিপদ দূর করবে, আল্লাহ তাআলা কিয়ামত দিবসের বিপদসমূহ থেকে তার একটি বিপদ দূর করে দেবেন।” (সহীহ মুসলিম, হাদীস, ২৫৮০)

কাছাকাছি আরেকটি হাদীসের ভাষ্য হলো:

وَاللَّهُ فِي عَوْنِ الْعَبْدِ مَا كَانَ
الْعَبْدُ فِي عَوْنِ أَخِيهِ

“বান্দা যতক্ষণ তার ভাইয়ের সাহায্যে থাকে, আল্লাহ ততক্ষণ সে বান্দার সাহায্যে থাকেন।” (সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৬৯৯)

তবে এখানে সতর্কতার সাথে মনে রাখতে হবে, অপরকে সাহায্য করার এই নির্দেশনা শুধুমাত্র তখনই প্রযোজ্য, যখন সেই ব্যক্তিটি অন্য কারো হাতে মজলুম বা নির্যাতিত হবে। কিন্তু সে যদি নিজেই জালেম হয়—যেমন কারো ওপর অন্যায়ভাবে চড়াও হয়েছে—তাহলে এ কাজে কিছুতেই তাকে সাহায্য করা যাবে না। বরং তাকে জুলুম থেকে বাধা দিয়ে নিবৃত্ত করতে হবে, এটিই তখন ভ্রাতৃত্বের দাবী। সহীহ বুখারীতে এ বিষয়ে স্পষ্টভাবে সতর্ক করা হয়েছে। (সহীহ বুখারী, হাদীস ২৪৪৩)

তৃতীয় দাবী—তুচ্ছতাচ্ছিল্য না করা:

মুসলিম শরীফের বর্ণনায় এসেছে,

وَلَا يَحْقِرُهُ بِحَسْبِ امْرِئٍ مِنَ
الشَّرِّ أَنْ يَحْقِرَ أَخَاهُ الْمُسْلِمَ.

“কোনো মুসলিম অপর মুসলিমকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করবে না। আর নিজের মুসলিম ভাইকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা কোনো ব্যক্তির মন্দ হওয়ার জন্য যথেষ্ট।” (সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৫৬৪) এটাই ভ্রাতৃত্বের দাবী; কারো বেশভূষা, ভাষা, বর্ণ ইত্যাদি নিয়ে উপহাস বা ঠাট্টা করা যাবে না।

চতুর্থ দাবী—দোষত্রুটি গোপন রাখা:

নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন:

وَلَا تَتَّبِعُوا عَوْرَاتِهِمْ فَإِنَّهُ مَنْ
تَتَبَّعَ عَوْرَةَ أَخِيهِ الْمُسْلِمِ تَتَبَّعَ اللَّهُ عَوْرَتَهُ وَمَنْ
تَتَبَّعَ اللَّهُ عَوْرَتَهُ يَفْضَحْهُ وَلَوْ فِي جَوْفِ رِحْلِهِ.

“তোমরা তাদের দোষত্রুটি খুঁজে বেড়িয়ো না। কেননা যে ব্যক্তি নিজ ভাইয়ের গোপন ত্রুটি খুঁজে বেড়ায়, আল্লাহও তার ত্রুটি অনুসন্ধান করবেন। আর আল্লাহ যার দোষ খোঁজ করবেন, তাকে লাঞ্ছিত করে দেবেন—এমনকি সে তার ঘরের ভেতরে থাকলেও।” (সুনানে তিরমিযী, হাদীস ২০৩২)

মানুষ মাত্রই ভুল। একমাত্র নবী-রাসূল ব্যতীত কেউই ভুলত্রুটির ঊর্ধ্বে নন। কেউ যদি কারো ত্রুটি অনুসন্ধানে নেমে যায়, তবে সে অবশ্যই কিছু না কিছু দোষ বের করতে পারবে। তারপর মানুষের সামনে এগুলো প্রকাশ করলে সে লজ্জিত ও লাঞ্ছিত হবে। এভাবে কাউকে অপদস্থ করার পরিণতি যে কতটা ভয়াবহ, হাদীসে তা উঠে এসেছে। দোষ খোঁজা তো পরের কথা, হাদীসের শিক্ষা হলো—কারো গোপন কোনো দোষ যদি সামনে প্রকাশ পেয়েও যায়, তবে তা লুকিয়ে রাখতে হবে। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:

وَمَنْ سَتَرَ مُسْلِمًا سَتَرَهُ اللَّهُ
يَوْمَ الْقِيَامَةِ.

“যে ব্যক্তি কোনো মুসলিমের দোষত্রুটি গোপন রাখবে, আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন তার দোষ গোপন রাখবেন।” (সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৫৮০)

পঞ্চম দাবী—সম্পর্ক ছিন্ন না করা:

এক মুসলিম অপর মুসলিমের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করবে না। কোনো কারণে মনোমালিন্য দেখা দিলেও তিন দিনের বেশি কথা বলা বন্ধ রাখবে না। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:

لَا يَحِلُّ لِمُسْلِمٍ أَنْ يَهْجُرَ أَخَاهُ فَوْقَ
ثَلَاثٍ.

“কোনো মুসলিমের জন্য হালাল নয় তার ভাইয়ের সাথে তিন দিনের বেশি সম্পর্ক ছিন্ন রাখা।” (সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৫৬০)

এটিই সাধারণ নিয়ম। তবে নির্দিষ্ট কিছু গুরুত্বপূর্ণ কারণে শরীয়ত ক্ষেত্রবিশেষে কারো সাথে সম্পর্ক না রাখার অনুমতি দিয়েছে একটি জরুরী ব্যবস্থা হিসেবে। সেই কারণ ও শর্তের বিস্তারিত বিবরণ ফিকহ ও ফতোয়ার কিতাবে রয়েছে।

ষষ্ঠ দাবী—অপরের জন্য কল্যাণ পছন্দ করা:

নিজের জন্য যে কল্যাণ ও ভালো বিষয় পছন্দ করবে, অপর মুসলিম ভাইয়ের জন্যও তাই পছন্দ করবে। হাদীসে এসেছে:

لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى يُحِبَّ
لِأَخِيهِ مَا يُحِبُّ لِنَفْسِهِ.

“তোমাদের কেউই প্রকৃত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে তার ভাইয়ের জন্য তা-ই পছন্দ করে, যা নিজের জন্য পছন্দ করে।” (সহীহ বুখারী, হাদীস ১৩)

সপ্তম দাবী—শান্তি ও সন্ধি স্থাপন করা:

যদি মুসলিমদের মাঝে পারস্পরিক বিতণ্ডা, ঝগড়া বা লড়াই দেখা দেয়, তবে তা নিরসন করা এবং তাদের মাঝে শান্তি ও সন্ধি স্থাপন করাও ভ্রাতৃত্বের দাবী। কুরআনে কারীমে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,

إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ فَأَصْلِحُوا
بَيْنَ أَخَوَيْكُمْ.

“মুমিনরা তো ভাই ভাই। অতএব তোমাদের দুই ভাইয়ের মাঝে তোমরা সন্ধি স্থাপন করো।” (সূরা হুজুরাত, আয়াত: ১০)

অষ্টম দাবী—পারস্পরিক হক আদায় করা:

ইসলাম মুসলিমদের মাঝে পারস্পরিক ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক তৈরি করার পাশাপাশি একজনের ওপর অন্যজনের কিছু হক বা অধিকারও নির্ধারণ করে দিয়েছে।

নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:

حَقُّ الْمُؤْمِنِ عَلَى الْمُؤْمِنِ سِتٌّ:
يَعُودُهُ إِذَا مَرِضَ، وَيَشْهَدُهُ إِذَا مَاتَ، وَيُجِيبُهُ إِذَا دَعَاهُ،
وَيُسَلِّمُ عَلَيْهِ إِذَا لَقِيَهُ، وَيُشَمِّتُهُ إِذَا عَطَسَ، وَيَنْصَحُ
لَهُ إِذَا غَابَ أَوْ شَهِدَ.

“এক মুমিনের উপর অন্য মুমিনের ছয়টি হক রয়েছে—সে অসুস্থ হলে তাকে দেখতে যাবে, মারা গেলে জানাজায় উপস্থিত হবে, দাওয়াত দিলে তা কবুল করবে, দেখা-সাক্ষাতের সময় সালাম করবে, হাঁচি দিলে তার জবাব দেবে, এবং সে উপস্থিত থাকুক বা অনুপস্থিত—সর্বাবস্থায় তার কল্যাণ কামনা করবে।” (সুনানে তিরমিযী, হাদীস: ২৭৩৭)

ভ্রাতৃত্বের দাবী হলো এ জাতীয় দায়িত্ব ও হকগুলো যত্ন এবং আন্তরিকতার সাথে আদায় করা। এখানে আমরা এমন কিছু বিষয় আলোচনা করলাম যেগুলো ভ্রাতৃত্ববোধের দাবী, পাশাপাশি এগুলো ভ্রাতৃত্ববোধের আলামত ও নিদর্শনও বটে। আমি অপরকে আসলে ভাই মনে করতে পারছি কি না, তা এই নিদর্শনগুলোর সাহায্যেই বোঝা যাবে।

ভ্রাতৃত্ববোধের পথে অন্তরায়গুলো কী?

ইতিপূর্বে একটি অন্তরায় (জাত্যাভিমান) নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। হাদীস শরীফে বিষয়টি আরও বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে। দুইজনের সম্পর্ক কেন ভেঙে যায়? কেন বাড়ে দূরত্ব ও অবিশ্বাস? ঈমানি ভ্রাতৃত্বের বন্ধন দুর্বল হয়ে যাওয়ার কারণ কী? নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এসব কারণ চিহ্নিত করে আমাদের সতর্ক করেছেন। একটি হাদীসে তিনি বলেন:

إِيَّاكُمْ وَالظَّنَّ فَإِنَّ الظَّنَّ
أَكْذَبُ الْحَدِيثِ وَلَا تَجَسَّسُوا وَلَا تَحَسَّسُوا وَلَا تَنَافَسُوا وَلَا
تَحَاسَدُوا وَلَا تَبَاغَضُوا وَلَا تَدَابَرُوا وَكُونُوا عِبَادَ اللَّهِ
إِخْوَانًا

“তোমরা মন্দ ধারণা থেকে দূরে থাকো, কেননা মন্দ ধারণা সবচেয়ে বড় মিথ্যা কথা। তোমরা কারো গোপন কথা কান পেতে শুনো না, কারো দোষ অনুসন্ধান করো না, পরস্পরের নিলামের ওপর ডাক দিয়ো না, একে অন্যকে হিংসা করো না, পরস্পরের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করো না এবং একে অন্যের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ো না। বরং হে আল্লাহর বান্দারা! তোমরা পরস্পর ভাই ভাই হয়ে যাও।” (সহীহ বুখারী, হাদীস ৬০৬৬)

মোটকথা, মানুষের অন্তরে দুঃখ-কষ্ট তৈরি করে এমন প্রতিটি কাজ ও আচরণই ভ্রাতৃত্বের বন্ধন ছিন্ন করে দেয়। তাই এসব কথা, কাজ ও আচরণ থেকে পুরোপুরি বিরত থাকতে হবে। তবেই মুসলিমদের মাঝে কাঙ্ক্ষিত ভ্রাতৃত্ববোধ ও সম্প্রীতি গড়ে উঠবে।

সহীহ বুখারীর উক্ত হাদীসের শেষে এ বিষয়ে তাকীদ করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সহান হোন। আমীন।