ঘুমের গাফিলতি ও আমাদের নীরব মৃত্যু—সাবের চৌধুরী

ঘুম: জীবনের উপাদান

একজন মানুষ যদি রাত-দিন মিলিয়ে প্রতিদিন গড়ে ৮ ঘণ্টা ঘুমায়, তাহলে জীবনের তিন ভাগের এক ভাগ সময় কেটে যায় ঘুমের মধ্যে—একপ্রকার নিস্পন্দ অবস্থায়। এর মানে, ত্রিশ বছর বয়সী একজন মানুষ বাস্তব জীবনে সজাগ ছিলেন মূলত বিশ বছর; বাকি ১০ বছর তার জীবন থেকে স্রেফ নাই হয়ে গেছে ঘুমের পথ ধরে।

হিসাবটা এভাবে সামনে আসার পর আমাদের মনে খুব সূক্ষ্ম একধরনের আফসোস জাগতে পারে। কিন্তু এটি মোটেও আফসোসের কিছু নয়; বরং ঘুম আল্লাহ তাআলার অনেক বড় একটি নিয়ামত। স্বয়ং আল্লাহ আমাদের শরীরের মধ্যে ঘুমের বীজটি রোপণ করে দিয়েছেন। একে আমরা চাইলেও জীবন থেকে বাদ দিতে পারব না।

যে বিষয়টি আমাদের জীবনের তিন ভাগের এক ভাগ জায়গা দখল করে আছে, যাকে নিয়ামত হিসেবে উল্লেখ করে আল্লাহ তাআলা একাধিক আয়াত নাজিল করেছেন এবং যার অভাবে আমাদের শরীর দুর্বল ও নিস্তেজ হয়ে আসে—তা নিশ্চয়ই অতীব গুরুত্বপূর্ণ কিছু। নিশ্চয়ই এমন কিছু, যার প্রতি অযত্ন ও অবহেলার কারণে আমাদের জীবন, সংসার, কর্ম ও স্বপ্ন সব এলোমেলো হয়ে যেতে পারে।

সুতরাং, হারিয়ে যাওয়া দশ বছর মূলত হারিয়ে যায়নি; বরং তা অবশিষ্ট বিশ বছরকে কাজের উপযোগী করেছে, উন্নত করেছে গুণগত মানে। ঘুম জীবনের জন্য এক পরম বিশ্রাম। আমাদের হাঁটা-চলা, চিন্তা ও কথা বলা—সবকিছুরই অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি এটি। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, “আর আমি তোমাদের নিদ্রাকে করেছি বিশ্রাম।” (সূরা নাবা: ৯)।


ঘুম নিয়ে হাহাকার

এ কারণে প্রতিদিন প্রতিটি মানুষেরই এই অধিকার আছে যে, সে তৃপ্তিদায়ক সুন্দর একটি ঘুম পাবে। কিন্তু দুঃখজনক ব্যাপার হলো, এই ঘুম নিয়ে এখন সর্বত্র একটি হাহাকার ছড়িয়ে আছে। কী ছোট, কী বড়; কী ঘরে, কী বাইরে—সবখানেই এক অবস্থা। বিশেষ করে পারিবারিক জীবনে এর নেতিবাচক প্রভাবটি অনেক বেশি এবং গভীর। এর জন্য সবচেয়ে দায়ী সম্ভবত ঘুমের প্রতি আমাদের অমনোযোগিতা ও অব্যবস্থাপনা। অথচ একটি পরিবার যদি সুখী ও সুন্দর হতে হয়, তবে ঘুমের ব্যবস্থাপনা ঠিক করা এবং প্রতিদিন পরিবারের সকল সদস্যের স্বাস্থ্যসম্মত ঘুম নিশ্চিত করা একান্ত আবশ্যক।

বিশেষ করে পরিবারের নারীদের ঘুম যদি পরিমাণে ও গুণগত মানে পূর্ণ না হয়, তবে এর নেতিবাচক প্রভাব শুধু তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; তা ছড়িয়ে পড়ে শিশুদের প্রতিপালনে, ঘরের ব্যবস্থাপনায় এবং পারস্পরিক সম্পর্কে। তাকে নিজের ঘুম পূর্ণ করতে হবে, ঘরের শিশুদের ঘুম নিশ্চিত করতে হবে এবং শিশুদের সামলে রেখে কিংবা ঘরের কাজ যথাসময়ে শেষ করার মাধ্যমে পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষদের ঘুমকেও নির্বিঘ্ন করতে হবে।


একটি সুন্দর দৃশ্য

দৃশ্যটা যদি এমন হয়—রাত্রির প্রথম অংশ পেরিয়েছে। খাওয়া-দাওয়া, নামাজ, বাচ্চাদের পড়াশোনা ও ঘুমের প্রস্তুতি সব শেষ। লাইটগুলো নিভে গিয়ে পুরো বাড়িতে সুন্দর একটি নৈঃশব্দ্য ছড়িয়ে পড়েছে। সারাদিনের ক্লান্তি শেষে সবাই শরীর এলিয়ে দিয়েছে বিছানায়। সবগুলো চোখে ঢল নেমেছে নরম ঘুমের। এর চেয়ে সুন্দর দৃশ্য আর কী হতে পারে? শেষ রাতে তাহাজ্জুদের জন্য তখন কাউকে ডাকতে হবে না; এমনিতেই তৃপ্ত মনে জেগে যাবে সবাই। এতে সকলের শরীর-স্বাস্থ্য যেমন ভালো হবে, তেমনি ঘরজুড়ে ছড়িয়ে পড়বে আমলের নূরানি পরিবেশ।

কিন্তু এমন একটি ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশ গড়ে তোলা একা নারীদের পক্ষে সম্ভব নয়। কারণ, ঘুম একটা সম্মিলিত ও সামাজিক ব্যাপার। একটা বড় পরিবারে কেউ চাইলেই একা একা নিজের ঘুমকে সুন্দর করতে পারে না। ঘরের ছোট-বড়, নারী-পুরুষ সবাই মিলে সম্মিলিত পরামর্শ ও সহযোগিতার মাধ্যমেই কেবল তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব।

বাড়িতে গুরুত্বপূর্ণ কোনো মেহমান এলে তার খাবার-দাবার নিয়ে কিংবা কোথাও বেড়াতে যাওয়ার আগে প্রস্তুতি বিষয়ে আমরা যেমন ভীষণ গুরুত্বের সাথে পরিকল্পনা করি, পরামর্শের পর পরামর্শ করি—ঘুমের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এমন একটি পরামর্শ কি নিকটকালে আমাদের পরিবারে হয়েছে? সমকালের বদলে যাওয়া এই পৃথিবীতে এটি খুবই দরকারি একটি প্রশ্ন বটে।


ঘুম কেন দরকার

ঘুম কত বড় নিয়ামত এবং এর অভাব আমাদের কী পরিমাণ ক্ষতি করে—প্রায় প্রতিদিন আমরা এ বিষয়ে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা লাভ করি। ফলে এটি বোঝার জন্য জটিল তত্ত্বকথা জানবার আবশ্যকতা নেই সত্য; তবু একটু গভীরে ঢুকে আরেকটু ভালোভাবে এর উপকারিতার দিকটি ধরতে পারলে ঘুম নিয়ে আমাদের উদ্যম ও উদ্যোগ বৃদ্ধি পাবে, সন্দেহ নেই। সেই সাথে ঘুম যে বিরাট একটি নিয়ামত, আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দার প্রতি অসম্ভব সুন্দর একটি উপহার, সে বিষয়টাও টের পাওয়া যাবে ভালোভাবে।

ঘুম কেন দরকার—চিকিৎসা বিজ্ঞানে এর সুন্দর একটি বিশ্লেষণ আছে। ঘুমের ভেতর আমাদের মন ও মস্তিষ্ক বিচিত্র অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে পার হয়। সেই ব্যাপারটি বোঝার জন্য পরিপূর্ণ একটি ঘুমকে আমরা একটি প্রস্তুতি ও ৪টি ঘুমপর্বে ভাগ করতে পারি:

  • প্রস্তুতি পর্ব: আমরা যখন জেগে থাকি, তখন আমাদের মস্তিষ্ক নানান কাজে মশগুল থাকে। এমনকি যখন অলস বসে থাকি, তখনও সে কাজ করে চলে কোনো বিরতি ছাড়াই। আর যেকোনো জিনিস ব্যবহৃত হলে তার ক্ষয় হয় এবং কিছু বর্জ্যও জমা হয়। মস্তিষ্কের ক্ষেত্রেও এই নিয়মটি পূর্ণমাত্রায় সত্য। সেখানেও ক্ষয় দেখা দেয়; নিষ্কাশনযোগ্য কিছু সূক্ষ্ম বর্জ্য ক্ষুদ্র নিউরনগুলোর চারপাশে আঠার মতো জমা হতে থাকে। ফলে একটি কোষের সাথে অন্য কোষের তথ্য আদান-প্রদান বাধাগ্রস্ত হয় এবং মস্তিষ্কের নিউরাল নেটওয়ার্ককে জট পাকিয়ে ফেলে।

    এই আঠালো বর্জ্য যেন আমাদের মস্তিষ্ককে পুরোপুরি নষ্ট করে না দেয়, সে জন্য আল্লাহ তাআলা আরেকটি রাসায়নিক দিয়েছেন। এটি সেই বর্জ্যের সমান্তরালে ছড়াতে শুরু করে। এর কাজ অনেকটা দারোয়ানের মতো। উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বর্জ্য জমা হয়ে মস্তিষ্কে যখন অচলাবস্থা সৃষ্টির আশঙ্কা দেখা দেয়, তখন সে সংকেত পাঠাতে শুরু করে—‘নিষ্কাশনের সময় হয়েছে, কাজ বন্ধ করে বিশ্রামে যাও’। বিশ্রামের এই সময়টিতে পূর্ণ উদ্যমে চলবে মেরামত ও সাফাইয়ের কাজ। এর জন্য প্রয়োজন ঘুম নামক আরামদায়ক একটি নিষ্ক্রিয়তা ও নির্জীবতা।

    সেই ঘুমকে ডেকে আনার জন্য দরকার ‘মেলাটোনিন’ নামক আরও একটি রাসায়নিকের। এই মেলাটোনিন আলোর মধ্যে স্বস্তি পায় না; রাত ও অন্ধকারের সাথে এর গভীর সম্পর্ক। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে আল্লাহ তাআলার নির্দেশে দিনের আলো মরে যায়। পৃথিবীর বুকে নিঃশব্দে নেমে আসে নরম একটি রাত; চারপাশ ছেয়ে যায় গভীর অন্ধকারে। সেই অন্ধকারে মস্তিষ্কের গোপন কুঠুরি থেকে চুপচাপ বেরিয়ে আসে মেলাটোনিন। রাতের সাথে পাল্লা দিয়ে তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে আমাদের রক্তের ভেতর।

    এটি শরীরকে শিথিল করে, জেগে থাকার উপাদানগুলোকে কমিয়ে আনে এবং সেসব উপাদান থেকে ছড়িয়ে পড়া উদ্দীপনা-সংকেতগুলোকে বন্দি করে। এর ফলে পঞ্চেন্দ্রিয় দিয়ে বাইরের জগৎ থেকে বিচিত্র তথ্য আসার মূল যে ফটকটি, সেটি বন্ধ হতে শুরু করে। ঠিক এই সময়টিই হলো আমাদের ঘুমের সূচনাপর্ব। এ সময়ে আমাদের হাত থেকে বই পড়ে যায়, ঝিমুনি আসে এবং আমরা নিস্তেজ হতে শুরু করি। ঢলে পড়ি ঘুমের কোলে। কিন্তু ঘুমোতে যাওয়ার সময়টিতে আমরা যখন মোবাইল ব্যবহার করতে শুরু করি, তখন মেলাটোনিন মিলিয়ে যেতে থাকে। জেগে থাকার উপাদানগুলো আবারও সক্রিয় হয় এবং আমাদের ঘুম আসতে দেরি হয়; দেখা দেয় অনিদ্রা রোগ।

মেলাটোনিনের ডাক শুনে আমরা কোথায় যাই? এ বিষয়ে কুরআনুল কারীমে চমৎকার একটি আয়াত আছে। সূরা জুমারের ৪২ নং আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন:

“আল্লাহ (প্রাণীদের) রূহ তাদের মৃত্যুর সময় কবজ করে নেন, আর যাদের মৃত্যুর সময় আসেনি তাদের রূহও কবজ করেন তাদের নিদ্রাকালে। অতঃপর যাদের ব্যাপারে মৃত্যুর ফয়সালা করেছেন তাদের রূহ রেখে দেন, আর অন্যদের রূহ পাঠিয়ে দেন এক নির্দিষ্ট সময়ের জন্য। নিশ্চয়ই এতে চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য রয়েছে নিদর্শন।”

এই আয়াতের ব্যাখ্যায় হযরত শাহ আবদুল কাদের রহ. লিখেছেন:

‘আল্লাহ তাআলা প্রতিদিন নিদ্রায় প্রাণ নিয়ে নেন, পরে আবার পাঠিয়ে দেন। এ-ই আখেরাতের নিদর্শন। বোঝা গেল, ঘুমের মধ্যেও ‘রূহ’ চলে যায়, যেমন চলে যায় মৃত্যুর সময়। নিদ্রায় চলে যাওয়ার পর যদি রয়ে যায়, আর ফিরে না আসে, তবে তাই মৃত্যু। অবশ্য এই ‘রূহ’ বলতে হুঁশ বা চৈতন্য উদ্দেশ্য। আরেকটি হচ্ছে সেই ‘রূহ’, যা দ্বারা শ্বাস চলে, হৃদস্পন্দন চালু থাকে এবং খাদ্য হজম হয়। এটা মৃত্যুর আগে দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয় না।’ (তাফসীরে উসমানীর বরাতে মূযেহুল কুরআন)।

———————————

———————————-

এই নিস্তেজতা বা বিশেষ রকমের মৃত অবস্থাটিকে চিকিৎসা বিজ্ঞান মোট ৪টি স্তরে ভাগ করেছে। ৪ স্তরে ৪ ধরনের কাজ হয়। এই কাজগুলো বুঝতে পারলে আমরা টের পাব, ঘুমের ভেতর এমন নিস্তেজতা ও মৃত্যু কেন দরকার ছিল। সেই সাথে এটাও বুঝতে পারব, ঘুম আমাদের জীবনের জন্য কত বড় একটি নিয়ামত এবং কতটা দরকারী বিষয়।


ঘুমের বিচিত্র স্তর ও আল্লাহর মহান কুদরত

  • প্রথম স্তর—যাত্রা শুরু: এটি সজাগ অবস্থা থেকে ঘুমের জগতে প্রবেশের পাতলা একটি স্তর। এ সময় হার্টবিট ও শ্বাস-প্রশ্বাস ধীর হয়ে আসে, পেশিগুলো শিথিল হতে থাকে। এই অবস্থাটি মোটামুটি ১০ মিনিটের মতো স্থায়ী হয়।
  • দ্বিতীয় স্তর—গভীর ঘুমের আগে: এই স্তরে আমরা অবস্থান করি পুরো ঘুমের প্রায় ৫০% সময়। একে বলা যায় গভীর ঘুমের প্রবেশদ্বার। এ সময় শরীরের তাপমাত্রা আরও কমে যায় এবং হার্ট রেট আরও স্থিতিশীল হয়। এখানে থাকা অবস্থায় মস্তিষ্ক দ্রুতগতির কিছু বিদ্যুৎ-সংকেত তৈরি করে। এই সংকেতগুলো বাইরের আওয়াজ সত্ত্বেও আমাদেরকে ঘুমিয়ে থাকতে সাহায্য করে। সারাদিনের ছোটখাটো তথ্যগুলো মস্তিষ্ক এই সময়েই বিন্যস্ত করতে শুরু করে।
  • তৃতীয় স্তর—দেহের মেরামত: এই ধাপটি সবচেয়ে বিস্ময়কর এবং অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এ সময়ে ‘গ্লিয়াল সেল’ নামক একধরনের সাফাইকর্মী সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং পরিচ্ছন্নতা অভিযান শুরু করে। মস্তিষ্কের কোষগুলো তখন সংকুচিত হয় এবং কোষের মধ্যবর্তী ফাঁকা জায়গা বেড়ে যায়। এই ফাঁকা জায়গা দিয়ে বিশেষ একধরনের তরল প্রবাহিত হয় এবং সারাদিনের জমা হওয়া বিষাক্ত বর্জ্যগুলো ধুয়ে পরিষ্কার করে দেয়। একই সাথে আরও একটি তরল পুরো দেহে ছড়িয়ে পড়ে আমাদের শরীরের টিস্যুগুলো মেরামত করতে শুরু করে, পেশি গঠন করে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে তোলে। কিন্তু আমরা যদি ঘুমের মাধ্যমে উপযোগী এই পরিস্থিতি তৈরি না করি—লম্বা সময় জেগে থাকি, তখন এই পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা বিভ্রান্ত হয়ে বর্জ্যের পাশাপাশি মস্তিষ্কের সুস্থ ও দরকারী কোষগুলোকেও নষ্ট করতে শুরু করে। তখন দেখা দেয় ভুলে যাওয়ার রোগসহ আরও নানান জটিল ব্যাধি।
  • চতুর্থ স্তর—বিস্ময়কর স্বপ্নের জগৎ: ঘুমের সবচেয়ে গভীর পর্বটি সেরে আসার পর আমরা এই সময়ে এসে প্রবেশ করি স্বপ্নের রঙিন জগতে। শরীর ঘুমিয়ে থাকলেও মস্তিষ্ক তখন ভীষণ সক্রিয় হয়ে ওঠে। অপরদিকে আল্লাহ তাআলা কুদরতিভাবে আমাদের পুরো শরীরে ছড়িয়ে দেন একটি নিরাপদ অবশ ভাব। আঙুল নাড়ানোর শক্তি বা সাড়াটুকুও অবশিষ্ট থাকে না; রীতিমতো প্যারালাইসিসে আক্রান্ত রোগীর মতো হয়ে যাই আমরা। কুদরতি এই ব্যবস্থা দেওয়া হয় যেন স্বপ্নে বিভোর হয়ে হাত-পা ছুড়ে আমরা নিজের বা পাশের মানুষের ক্ষতি না করে বসি। এই স্তরে মস্তিষ্ক আমাদের অর্জিত তথ্য বিশ্লেষণ করে, দীর্ঘমেয়াদি স্মৃতিগুলোকে গঠন করে, সৃজনশীল চিন্তা গুছিয়ে নেয় এবং আমাদের আবেগ নিয়ন্ত্রণে বিরাট ভূমিকা রাখে।


আমি কি মরে যাচ্ছি?

প্রসঙ্গত, কখনো এমন হয় যে এই সময়ে এসে আমাদের ঘুম ছুটে যায় বা অনেক বেশি হালকা হয়ে যায়। তখন মস্তিষ্ক কিছুটা বিভ্রান্তি বোধ করে। একদিকে শরীর অবশ হয়ে আছে, অপরদিকে মস্তিষ্ক হয়ে আছে পুরোদমে সজাগ ও সক্রিয়। কিন্তু মাঝখানে ঘুম ছুটে যাওয়াতে সাময়িক সময়ের জন্য আমরা ভয়ংকর একটা বন্দিত্বের মধ্যে আটকে পড়ি। মনে হয় শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে এবং আমি মারা যাচ্ছি। তবে এটি সে অর্থে ভয়ংকর কিছু নয়; খানিক পর এমনিতেই সব স্বাভাবিক হয়ে আসে। এ সময়ে মুক্তি পাওয়ার জন্য বেশি তাড়াহুড়ো করলে কষ্ট বরং বেড়ে যায়। তাই শান্ত হয়ে দোয়া পড়তে থাকা ও আল্লাহর কাছে সাহায্য চেয়ে অপেক্ষা করাই কল্যাণকর।

এই ৪টি পর্বের মাধ্যমে ঘুমের পূর্ণ একটি বৃত্ত সম্পন্ন হতে মোটামুটি ৯০ থেকে ১২০ মিনিটের প্রয়োজন হয়। এরপর আমরা দ্বিতীয় বৃত্তে প্রবেশ করে আবারও শুরু থেকে পর্ব ৪টি শেষ করি। এভাবে চক্রাকারে আবর্তিত হয় আমাদের ঘুম। কে কয়টি চক্র পূর্ণ করবে, ব্যক্তিভেদে তা ভিন্ন হয়। অবশ্য সবগুলো চক্রের সময়কাল সমান নয়; যতই সামনের দিকে এগিয়ে যাই, বৃত্ত সম্পন্ন হওয়ার সময় ততই কমতে থাকে।

সুতরাং, আমাদের জীবনে ঘুম শুধুই একটি আনন্দদায়ক ব্যাপার নয়, কেবলই একটি সাধারণ বিশ্রাম ও উপভোগও নয়; বরং এটি আল্লাহ প্রদত্ত সেই মহান নিয়ামত, যা আমাদের সুস্থতা ও সুন্দর জীবনধারণের জন্য অনিবার্য ও বিস্ময়কর একটি উপাদান।

সেই বৃত্তগুলো যদি দিনের পর দিন অপূর্ণ থেকে যায়, শরীর মেরামতের জন্য গভীর ঘুমের সেই পর্বটি যদি আমরা না পাই, তাহলে আমাদের শরীর ধীরে ধীরে নষ্ট হবে, মস্তিষ্ক ক্ষয় হতে থাকবে এবং শরীরে দেখা দেবে বিভিন্ন জটিল ও দুরারোগ্য ব্যাধি। যারা নিয়মিত ঘুমাতে পারে না, তাদের স্মরণশক্তি কমে যাওয়া খুবই সাধারণ একটি ঘটনা।


সুন্দর ঘুমের জন্য যা দরকার

শরীরের জন্য সুন্দর ও উপকারী একটি ঘুম পেতে হলে বড় তিনটি বিষয় নিশ্চিত করতে হবে:

১. সময়কাল: একেক বয়সের মানুষের জন্য ঘুমের প্রয়োজন একেক রকম। এটি নির্ভর করে তার বয়স, শারীরিক অবস্থা, পরিশ্রম ইত্যাদির ওপর। তবে গড়ে প্রাপ্তবয়স্ক একজন মানুষকে তো ছয়-সাত ঘণ্টা ঘুমাতেই হয়। কেননা শরীর এবং মস্তিষ্কের পূর্ণাঙ্গ মেরামতের কাজে তাড়াহুড়ো চলে না; একটি নির্দিষ্ট সময় এখানে খরচ করতে হবেই। যদি পর্যাপ্ত সময়টা দিতে না পারি, তাহলে মস্তিষ্কের পরিচ্ছন্নতাকর্মী তথা গ্লিয়াল সেলগুলো তাদের কাজ শেষ করার প্রয়োজনীয় সময় পায় না।

২. ধারাবাহিকতা: ধারাবাহিকতার অর্থ হলো প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমানো, নির্দিষ্ট সময়ে জাগ্রত হওয়া এবং একটানা লম্বা ঘুম গ্রহণ করা। উপকারী ঘুমের জন্য এই দুটি বিষয় খুবই দরকারি। প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমালে শরীরের হরমোনের নিঃসরণ নিয়মিত হয়, ফলে ঘুম দ্রুত আসে। আল্লাহ তাআলা আমাদের শরীরের মধ্যে বিশেষ একটি ঘড়ি তৈরি করে দিয়েছেন; এটি আলোকে সজাগ থাকার এবং অন্ধকারকে ঘুমের সংকেত হিসেবে গ্রহণ করে। এ কারণেই সন্ধ্যার পর রাত যখন এক-তৃতীয়াংশ পেরিয়ে যায়, তখন এই ঘড়ির সংকেতে মেলাটোনিন নামক ঘুমের রাসায়নিক তরলটি রক্তের ভেতর ছড়িয়ে পড়ে এবং আমাদেরকে ঘুমিয়ে পড়ার জন্য জোরালো নির্দেশ দিতে শুরু করে।

এই নির্দেশ মেনে আমরা যদি ঘুমিয়ে যাই, তাহলে শেষ রাতে সুন্দর একটি ঘুম সম্পন্ন করে উঠতে পারব; শরীর থাকবে সতেজ, প্রাণবন্ত ও ফুরফুরে। মশগুল হতে পারব আল্লাহ তাআলার ইবাদতে। এশার পরপর ঘুমিয়ে পড়ার সুন্নত স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামই আমাদেরকে শিখিয়ে গেছেন। হযরত আবু বারজা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এশার আগে ঘুমানো এবং এশার পরে কথাবার্তা বলা অপছন্দ করতেন।” (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)। অর্থাৎ, বিশেষ দ্বীনি কোনো প্রয়োজন না থাকলে এশার পর জেগে থাকা পছন্দনীয় নয়। শরীয়ত আমাদেরকে প্রথম রাতে আল্লাহর স্বাভাবিক নিজামে সাড়া দিয়ে ভরপুর ঘুমিয়ে, শেষ রাতে জেগে তাহাজ্জুদ পড়ার জন্য উৎসাহিত করেছে। নবীজির সুন্নত পালনেই আমাদের জন্য রয়েছে দুনিয়া ও আখেরাতের সার্বিক কল্যাণ।

কিন্তু তা না করে আমরা যদি একেক দিন একেক সময়ে ঘুমাই, তাহলে শরীরের এই অভ্যন্তরীণ ঘড়িটি বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। তখন দেখা দেয় অনিদ্রাসহ নানান জটিলতা। ফলে ভালো ঘুমের জন্য নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমানো এবং একটানা ঘুমানো খুবই জরুরি একটি বিষয়।

৩. গুণগত মান: যে ঘুম আমাদের শরীরকে নবায়ন করে, সতেজ করে, সুস্থ রাখে—সে ঘুমের জন্য গুণগত মান অনেক বড় একটি বিষয়। ঘুমের পরিবেশটি যথাসম্ভব আরামদায়ক হওয়া, ঘরে অতিরিক্ত গরম না থাকা, আলো না থাকা, শব্দ বা অন্য কোনো অসুবিধা না থাকা ভালো ঘুমের জন্য খুবই সহায়ক। একইভাবে পেটে গ্যাস থাকলে, বুকে জ্বালাপোড়া থাকলে কিংবা সম্পূর্ণ ভরপেটে ঘুমাতে গেলে আমাদের ঘুম গভীর হতে পারে না। ছাড়া-ছাড়া অগভীর ঘুম শরীর মেরামত ও মস্তিষ্ক সাফাইয়ের জন্য উপযোগী নয়; যার ফলে লম্বা সময় ঘুমিয়েও সারাদিন ঘুম-ঘুম ভাব থাকতে পারে, ভেঙে পড়তে পারে আমাদের শরীর, স্বাস্থ্য ও উছ্বলতা।

সুতরাং, ঘুম ঐচ্ছিক কোনো বিষয় নয়, অবহেলার বস্তুও নয়। ঘুম নষ্ট করছি মানে নিজের জীবনকেই হুমকিতে ফেলছি। পরিবারের কর্তা যিনি, তার উচিত ঘরের সম্মানিত নারীগণ প্রয়োজনীয় ঘুমটি ঠিকমতো পাচ্ছেন কি না, ছোট ছোট শিশুরা সময়মতো ঘুমাচ্ছে কি না, ঘরের বয়োবৃদ্ধ বা অসুস্থ মানুষগুলোর ঘুমে ব্যাঘাত হচ্ছে কি না—এ বিষয়গুলোতে তীক্ষ্ণ নজর রাখা। আর মায়েদের উচিত দিনের শুরু থেকেই রাতের ঘুমকে সামনে নিয়ে পরিকল্পনা সাজানো ও সে অনুযায়ী ঘরের কাজ সম্পন্ন করা। মনোযোগ ও পরিকল্পনা ছাড়া ছোট একটি কাজও যেখানে ভালোভাবে সম্পন্ন করা যায় না, সেখানে ঘুমের মতো বহু সদস্য সংশ্লিষ্ট, সম্মিলিত সামাজিক একটি জটিল কাজ সুন্দরভাবে কী করে সম্পন্ন হতে পারে?

শেয়ার করুন

image_print
লেখকের অন্যান্য লেখা

সূচিপত্র

সর্বাধিক পঠিত
উত্তম আখলাক: অনন্য ছয়টি মর্যাদা
ক্রোধ সংবরণ: কেন ও কিভাবে
ঈমানের পরিচয় ও প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা
হিন্দুত্ববাদী সন্ত্রাসের শিকার ভারতীয় মুসলমান ~ স্বরূপ ও নেপথ্য কারণ
কুরআনের আলো পেতে যে বিষয়গুলো লাগবেই!
নববী চিকিৎসা : কিছু প্রয়োজনীয় আলোকপাত