বর্ষার ছুটি

আমার বয়স যখন ছয় কি সাত  তখনই আমরা ঢাকা চলে আসি। ৪১/বি হরিচরণ রায় রোড ফরিদাবাদের আলাউদ্দিন সাহেবের বিল্ডিং এর ৬ষ্ঠ  তলায় আমাদের বাসা। পাখির বাসার মতই ছোট্ট, অস্থায়ী এবং ভূমি থেকে বেশ উপরে। তবে আমাদের বাসা ছাদসংশ্লিষ্ট হয়ায় ঢাকার অন্যান্য বাসা বন্দীদের চেয়ে আমাদের একটু বেশি মুক্তি এবং স্বাধীনতা ছিল। আমাদের বাসার সম্মুখে ছাদ আমাদের বাড়ির উঠোনের মতোই বড় প্রশস্ত এবং খোলামেলা ছিল। গ্রামে জন্ম নেয়া আমাদের জন্য শহরের আবদ্ধ জীবন ছিল বড্ড অসহনীয়। দম বন্ধ হয়ে আসতো। গ্রামের প্রশস্ত আনন্দদায়ক ছোটোছুটির জীবন থেকে হঠাৎ ঢাকার সংকীর্ণ আবদ্ধ জীবনে প্রবেশ করায় আমাদের জীবন থমকে গিয়েছিল। আম্মা সারাদিন ঝিম ধরে থাকতেন। আমরা জানালার গ্রিল ধরে বাইরে তাকিয়ে ডুকরে কেঁদে ওঠতাম।

রিক্সা ট্রাক প্রাইভেটকার সিএনজির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে রাস্তার পাশ ধরে নানা কিসিমের মানুষ দ্রুত হেঁটে  চলছে। সমস্ত কিছু ছাপিয়ে ট্রাক সিএনজি বাইকের হুইসেল এবং হকারের সুউচ্চ বিকট হাঁকে ইট বালুর বিল্ডিং কেঁপে উঠছে। তার সঙ্গে কখনো যুক্ত হচ্ছে দলবদ্ধ ফকিরদের সমবেত বেসুরা কণ্ঠে ফরিয়াদ। দূরে বুড়িগঙ্গা দেখা যায়। দীর্ঘ শান্ত কাঁপা কাঁপা শব্দ তুলে প্রায় পুরো শরীর ডুবিয়ে দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে বালুর ট্রলার। একগ্রাম মানুষ নিয়ে কি নির্বিকার আসছে যাচ্ছে লঞ্চ। মানুষ নিয়ে পারাপার হচ্ছে ছোট নৌকা। কখনো শান্ত স্বাভাবিকভাবেই। কখনো ঢেউয়ের সঙ্গে দুলে দুলে। চারদিক থেকে একসঙ্গে ভেসে আসে আজানের ধ্বনি। দূরে কোথা হতে ক্ষীন ভাঙ্গা ভাঙ্গা ঢেউখেলা কন্ঠের একটা আজানের সুর ঠিক আমাদের গ্রামের মসজিদের আজানের মতো ভেসে এসে মনে করিয়ে দেয় দাদু ফুফু উঠোন আঙিনা পুকুর মক্তব গরু বাছুর হাঁস-মুরগি চেনা মুখ চেনা সুর সব কিছুর কথা। আটকানোর চেষ্টা সত্ত্বেও চোখ বেয়ে নেমে আসে নোনা পানির জোয়ার। ঢাকা আসার অল্প কিছুদিনের মধ্যেই মাদ্রাসায় ভর্তি হয়ে যাই। জীবন আটকে যায় আরো শক্ত শৃংখলে। এক মূহুর্তের মুক্তির জন্যও প্রাণ ধড়ফড় ধড়ফড় করতে থাকে।

ছুটির আনন্দটাই আলাদা। ছুটি মানেই বাড়িতে যাওয়ার আনন্দ। মাকে ফিরে পাওয়ার সুখ। বইয়ের পাতা থেকে জীবনের নদীতে ঝাঁপ দেয়ার উত্তেজনা। আগামীকাল আবার একত্র হওয়ার শিহরণ। মক্তব ছুটি হতেই আনন্দে সবাই একসঙ্গে চিৎকার করে উঠতাম। ‘ছুটি গরম গরম রুটি এক কাপ চা সবাই মিল্লা খা’ সহ আনন্দমুখর অসংখ্য স্লোগানে মুখরিত আজও শৈশবের সোনালী সকাল। 

আরেকটু বড় হলে ছুটি আরো অর্থবহ হয়ে উঠে।সবক সাতসবক আমুখতা সবিনা দরস তাকরার পরীক্ষায় নিয়মতান্ত্রিক জীবন যখন হাঁপিয়ে উঠে। ভাতের থালায় তরকারির ঝোল আর ডালের পানিতে বাড়ির শূন্যতা মায়ের মুখ ছোট বোনের কান্না বাড়ির উঠোন‌ ভেসে উঠতেই বিষাদে ভরে যায় মন। কিছুই ভালো লাগে না আর। তখন ছুটির জন্য হাহাকার করে ওঠে হৃদয়। ছুটির সংবাদ বাতাসে ডানা ঝাপটে মায়ের ছবি বাড়ির পথ হলুদ পাখি লাল ফড়িং এবং সুখের প্রজাপতি এঁকে দিয়ে যায়।পরীক্ষার মত সীমাহীন কষ্ট কষ্টদায়ক পথ সহজ হয়ে যায় বাড়ির স্মরণে। এক সপ্তাহ আগ থেকেই শুরু হয়ে যায় বাড়ি যাওয়ার প্রস্তুতি। জামা ধুয়ে স্ত্রী করে রাখে কেউ। কেউ ভাঁজ করে বালিশের নিচে রেখে দেয়। একটু যাদের পয়সা আছে তারা ছোট ভাই বোনের জন্য খেলনা এবং শহরের মুখরোচক অভিনব বিচিত্র খাবার দাবার কিনে নেয়। ছুটির দিন তাকে কে নিতে আসবে তা জানতে উদগ্রীব হয়ে উঠে। জানালার গ্রিল ধরে বাড়ির দিকে তাকিয়ে থাকে। সঙ্গীদের দেখাতে থাকে, এই যে এই দিক দিয়ে আরেকটু সামনে গিয়ে নীল বাসে উঠে সোজা ঐ দিক দিয়ে ওদিকে গেলে একটা বাজার তারপরেই আমাদের বাড়ি। বাড়ির গল্প করতে করতে ঘুম আসে । মাকে দেখতেই লাফ দিয়ে জড়িয়ে ধরার আনন্দে ঘুম ভাঙ্গে। বয়স এবং পরিস্থিতির সঙ্গে সঙ্গে ছুটির অর্থ ভিন্ন হতে থাকে।

এই অর্থে ছুটি কখনোই আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেনি। আমাদের বাসা মাদ্রাসার কাছেই ছিল। সকাল আর রাতে আব্বু খাবার দিয়ে যেতেন। দুপুরে বাসায় গিয়ে খেয়ে আসতাম। মা বাবার শূন্যতা অনুভব হয়নি কখনো। তার ওপর ছুটিতে সবাই দূরে যেতো। গ্রামের বাড়ি। উন্মুক্ত জীবনে। আর আমার আসতে হতো পাখির নীড়ের মতো ছোট্ট বাসায়। আবদ্ধ জীবনে। তাই আমার কাছে মাদরাসাই ছিল উৎসবস্থল। মাদ্রাসা থেকে বাসায় ছিল আরো আবদ্ধ। আরো সংকীর্ণ। তাছাড়া বাসায় কেউ নেই। কিছু নেই। আব্বার চাপ ছিল হুজুরের চেয়েও বেশি। হুজুর তো যাও মেরে টেরে মানুষের মতো পড়ার জন্য চাপ দিতেন। আব্বা বলতেন, কবুতরের মতো সারাদিন কোরআন শরীফ জপতে থাকতে। বিপরীতে আমি একটুও পড়তে রাজি ছিলাম না। আমার যুক্তি ছিল, ছুটি দেয়াই হয়েছে না পড়তে। পড়াই যদি লাগতো তাহলে তো মাদ্রাসাই খোলা থাকত। ছুটির দরকার কি ছিল? আব্বা আবার ছুটি শেষে হুজুরকে আমার এই কুযুক্তির কথা জানিয়ে আমার জন্য অতিরিক্ত সমাদরের ব্যবস্থাও করেছিলেন। 

বাসায় কাম নাই কাজ নাই। দুষ্টুমিরো তেমন উপায় উপকরণ নাই। নিজেরাই উপকরণ সৃষ্টি করতাম। জিনিসপত্র নিয়ে আলমারির উপরে উঠে দোকান দিতাম। দরকারি বেদরকারী হিসেব না করে কাগজ কেটে তা দিয়ে নৌকা বিমান চাঁদ তারা গাছ ইত্যাদি বানাতাম। গাড়ি ঘড়ি লাইট এ জাতীয় ইলেকট্রিক অনেক দরকারি জিনিস ভেঙে চুম্বক বের করতাম।পলিথিনের মাথায় সুতা বেঁধে জানালা দিয়ে পুরো এক বান্ডেল সুতা ছেড়ে দিতাম।চেয়ার বা উঁচু কিছুতে উঠে দরজা খুলেই বাইরে দৌড়। কিছুক্ষণের মধ্যেই নিচ থেকে বিচার। ছাদে দৌড়াদৌড়ি লাফালাফির আওয়াজে সবাই অতিষ্ঠ।আম্মা অনেক কষ্ট করে এক দেড় দিন আমাদের প্রতি দয়া দেখতে পারতেন। একটু অতিরিক্ত আদর খাতির করতে পারতেন। তারপর আমাদের কীর্তিকলাপে অতিষ্ঠ হয়ে কখনো মারতেন কখনো বকতেন।

সারাদিন এভাবে সেভাবে কাটিয়ে সন্ধ্যায়  যখন ঘুমে চোখ টলমল করতো। ঠিক তখন আব্বা অফিস থেকে এসে নিয়ে যেতেন আবু সাঈদ সাহেব বা আব্দুস সালাম সাহেবের মজলিসে। আমি গিয়েই ঘুমিয়ে যেতাম। মাঝে মাঝে ঘুম ভাঙলে দেখতাম সব সময়ের মতো কিছু নির্দিষ্ট লোক। যারা প্রত্যেক মজলিসেই হাজির থাকেন। সারাদিনের ক্লান্তির কারণে তারাও ঝিমুচ্ছেন। আর হুজুর নির্বিকার শান্ত গলায় একটা আয়াত হাদিস পড়ে তরজমা তাফসীর ব্যাখ্যা করে যাচ্ছেন। সজাগ দু চারজনের সুবহানাল্লাহ শুনে ঝিমন্তরাও সুবহানাল্লাহ বলে উঠছেন। আর পুরো পরিবেশটা কেমন স্বর্গীয় সৌন্দর্যে ভরে থাকছে। মজলিস শেষে সবাই সিরিয়াল ধরে হুজুরের সঙ্গে মুসাফা করতেন। আব্বাও সিরিয়ালে দাঁড়াতেন আমাকে নিয়ে। হুজুর কাছে আসতেই আব্বা তড়িৎ সালাম মুসাফাহা সেরে আমাকে হুজুরের সম্মুখে ঠেলে দিয়ে বলতেন, আমার বড় ছেলে ওমর ফারুক।হেফজখানায় পড়ে। তারপর একটু কাতর বিস্তর পেরেশান কণ্ঠে বলতেন, পড়ায় অমনোযোগী-দুষ্টুমি করে-পেপার পড়ে। মুফতি সাহেব হুজুর হাস্যজ্জল দৃষ্টিতে তাকাতেন। মাথায় হাত রেখে কি যেন পড়ে মাথায় ফু দিয়ে বলতেন,বাচ্চারা একটু আকটু এরকম করেই। বড় হইলে ভালো হইয়া যাইবো। বেশি টেনশন কইরেন না। মুফতি আব্দুস সালাম সাহেব তেমন কিছু বলতেন না। শুধু মুচকি হাসতেন। চাচাও ঠিক এমনই করতেন। হুজুর আমার বড় ভাতিজা। বেশি দুষ্টুমি করে। একেবারে খায় না। একটু দোয়া করে দেন।

আরেকটু বড় হওয়ার পর ফজরের সময় আব্বার সঙ্গে মসজিদে গিয়ে  আস্তে উধাও হয়ে যেতাম। এলাকার কিছু সহপাঠী ছিল। তারাও ফজরে এলে একত্র হয়ে মাদ্রাসার ছাদে আশ্রয় নিতাম। সারাদিন সেখানেই থাকতাম। ফাঁদ পেতে জালালি কবুতর ধরতাম। সন্ধ্যায় বাসায় ফিরতাম। মেরে লাভ নেই। ফজরে আবার উধাও।বাধ্য হয়ে কখনো কখনো আব্বা মসজিদেই নিয়ে যেতেন না।

তবে রোজা এবং কোরবানি ঈদের ছুটি কিছুটা উপভোগ্য হতো। ঈদের এক দুই দিন পর গ্রামে যাওয়া হতো। শহরের বন্দে জীবন থেকে মুক্তির আনন্দে আগের রাত ঘুম হতো না। দাদুর বাড়িতে কি করবো? নানার বাড়ির দিনগুলো কিভাবে কাটাবো? সে চিন্তা করেই পার হয়ে যেত। তখন রোজা বা কোরবানির ছুটি বর্ষাকালে পড়ত‌।কখনো বর্ষার পূর্ণ যৌবনে। কখনো সূচনা বা অন্তিম মুহূর্তে।আমাদের দাদার বাড়ি কিংবা নানার বাড়ির কাছে কোথাও নদী নেই। বড় বড় বিল আছে। যাতে মানুষ ফসল করে। বর্ষায় বিলগুলো ভরে যায় বৃষ্টির পানিতে। দূরের কোনো খালের সঙ্গে মিলে যায়। পুটি কৈ শোল শিং  বাইম বুইত্তা টেংরা চিতল বোয়াল ছোট-বড় নানান মাছে বিল ভরে উঠে। আমরা সারাদিন পড়ে থাকতাম বিলে। অনেক কষ্ট করে দুচারটা ছোট মাছ ধরতে পারতাম। সেগুলো মানুষ সাধারণত খায় না। তারপর উঠোনে গর্ত করে পুকুর বানিয়ে জিইয়ে রাখতাম। আমাদের কাজে বড়রা বেশ বিরক্ত হলেও বেড়াতে এসেছি বলে কেউ কিছু বলতেন না তেমন।

নানার বাড়িতে আমার এক মামাতো ভাই ছিলেন। কাউসার নাম। বড়সড় মানুষ। তিনি ছিলেন মাছের পোক। দিনরাত মাছ ধরতেন। কারেন্ট জাল খেই জাল টানা জাল ফেলা জাল সহ মাছ শিকার করার মোটামুটি সব কিছুই ছিল তার কাছে। শুধু হাত দিয়ে তিনি যে পরিমাণ মাছ ধরতেন অন্য কয়েকজন জাল চল দিয়েও  তা ধরা মুশকিল ছিল।  শিং শৈল টেংরা কই বাইম বুইত্তা কোন মাছই তার হাত ফসকে বের হতে পারত না। শিং মাছের কাটা খেতে খেতে তার হাতে এখন কোন কাটাই প্রভাব ফেলে না।

বাড়ির ছোট ছেলেমেয়েরা, জোলাবাতি রাধতে চাইলে তার কাছে মাছ ধরে দেয়ার বায়না করত। তিনি না করতেন না। পেঁয়াজ কালারের ঢোলা একটা পায়জামা যা মূলত মামার ছিল পড়ে নেমে যেতেন পুকুরে। নানান জাতের দেশী মাছ ধরে পকেটে পুরতেন। শিং টেংরা ধরলে কাঁটা ভেঙে পকেটে রাখতেন।পুরো পুকুরের চারপাশ হেঁটে ডুব দিয়ে পকেট ভর্তি মাছ এনে দিতেন। 

পাখি শিকার গাছ লাগানো ক্ষেত খামার করা সহ গৃহস্থালী সব কাজেই সমান পারদর্শী ছিলেন। মাছ মারা পাখি শিকারের নেশাটা মূলত পেয়েছেন মামার থেকেই।

মামা এসবে ছিলেন আরো দক্ষ এবং শক্ত। কাঠবিড়ালির মত একটা দুষ্ট প্রাণীও বাঁচতে পারত না তার হাত থেকে। 

যেদিন মামা মারা যান সেদিন রসিকতা করে কেউ কেউ বলছিল আজকে কাঠবিড়ালীর আনন্দের দিন। নানুর বাড়িতে গিয়েই যোগ দিতাম কাউসার ভাইয়ের সঙ্গে।সারাদিন তার সঙ্গেই থাকতাম।মেঘে-বানে তুফানে। রাতে দিনে। সব সময় সবখানে।

কখনো ভেলায় চড়ে বিল ধরে বাড়ি থেকে অনেক দূরে চলে যেতাম। চারিদিকে পানি আর পানি। কোথাও মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে এক দুইটি গাছ। ছোট্ট কুঁড়ে ঘর। আকাশে উড়ছে সাদা বকের ঝাঁক। মাছরাঙা শালিক ডাহুক পানকৌড়ি সহ নাম না জানা অসংখ্য পাখির ছুটোছুটি। হঠাৎ লাফিয়ে উঠে হারিয়ে যাচ্ছে নতুন পানির ছোট মাছ।বিল জুড়ে ঘন সন্যেবেশিত সবুজ লতা পাতা ও কচুরিপানা। মাঝে মাঝে শাপলার সমারোহ। দূর থেকে দেখলে মনে হয় ফুল করা সবুজ কার্পেট বিছানো।

 রাতে চল বা টেডা নিয়ে বের হতেন।আরেক হাতে টর্চ লাইট। আমার হাতে থাকতো একটা টর্চ একটা ব্যাগ।অতিরিক্ত থাকতো একটা গ্যাস লাইট একটা লোহার টুকরা এবং কাফিলা গাছ নামের পথের পাশে বেড়ে ওঠা বিশেষ এক প্রকার গাছের একটা ডাল।এগুলো ছিল জিন শায়েস্তার জন্য। কাঁচা মাছ নাকি জিনের প্রিয় খাবার। মাছ থাকলে জীন চলে আসে। নানান কৌশলে মাছ খেয়ে ফেলে। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন মানুষের সুরত ধরে আসে। জীন নাকি আগুন লোহা এবং কাফিলা গাছের ডালকে বেশ ভয় পায়। তাই এগুলো নেয়া। কাউসার ভাই মাছ ধরতেন আর জীনের আজগুবি কিচ্ছা কাহিনী শোনাতেন।তার সঙ্গে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনার কথাও বলতেন। আমি ভীষণ অবাক হয়ে বলতাম, আপনার সঙ্গে ঘটেছে এই ঘটনা? আপনি জীন দেখেছেন? তিনি পেছনে ঘাড় ঘুরিয়ে একটা অদ্ভুত হাসিতে মাথা নাড়িয়ে বলতেন, হ। ভয়ে তখন তাকেই জীন মনে হতো আমার। বারবার তার পায়ের দিকে লাইট মেরে দেখতাম পা সোজা না উল্টা!

জীনের মাছ খাওয়ার প্রায় ঘটনা এক রকম। এক লোক মাছ ধরছে আর সঙ্গীর কাছে দিচ্ছে। একবার সে আশ্চর্য হয়ে খেয়াল করল।সে যতই মাছ দিচ্ছে ব্যাগ ভরছে না। তার সন্দেহ হলো। আরেকবার মাছ দিয়ে লুকিয়ে বিষয়টা দেখার চেষ্টা করল। সে সামনে ফিরতেই তার সঙ্গীর সামনের দাঁত দুটি লম্বা হয়ে বেরিয়ে এল। মুখ গহবর লাল। মুখ বেয়ে লালা পড়ছে। কটকট করে মুহুর্তে মাছটা খেয়ে ফেলল। আবার পা দুটো উল্টা। সে চিৎকার দিয়েই বেহুশ। পরদিন তার লাশ পাওয়া যায় বিলের মাঝখানে। পা উপরের দিকে মাথা কাদামাটিতে গুঁজে দেয়া। অথবা কোনরকম দৌড়ে ঘরে আসলে কয়েকদিন ভীষণ জরে ভোগে। তারপর মারা যায়। 

আস্তে আস্তে ঈদের পরের যাওয়া কমে গেছে।ইট বালুর শহরে জীবন আটকে গেছে। কখনো কোনো প্রয়োজনে গেলেও হাত পা গুটিয়ে চলা হয়। কাঁদা পানি থেকে বাঁচতে ঘরেই বসে থাকা হয়।

আব্বার চাকরী শেষ হয়ে পেনশনের নির্দিষ্ট টাকাও কমে আসায় গত রমজানের পূর্বে একটা ট্রাকে করে আমাদের শহরের জীবনকে গ্রামে নিয়ে যাওয়া হয়। এখন আমরা গ্রামের বাসিন্দা। আগে ছুটি হলে ছুটে আসতাম ফরিদাবাদ এখন ছুটে যেতে হয় চাঁদপুর। এখন আমার আয়োজন করে বাড়িতে যাওয়ার সুযোগ এসেছে। কিন্তু আগের সেই আবেগ উচ্ছাস উত্তেজনা শিহরণ কিছুই নেই। ১ম সাময়িক পরীক্ষা শেষ হয়ে মাদরাসা ছুটি হয়েছে। মাদ্রাসা ছুটি হওয়ার এক দিন পর বাড়িতে গিয়েছি। এবারের ছুটি পড়েছে পূর্ণ বর্ষায়। শ্রাবণের ধারাবাহিক বর্ষণের সময়।পুরো ছুটি জুড়েই ছিল বিরতিহীন বৃষ্টি। কখনো মুষলধারায় কখনো একটু কম।খাল বিল পুকুর ডোবা সব কানায় কানায় ভরে উঠেছে। কিন্তু খালে বিলে আগের মতো মাছ নেই। মানুষের মধ্যেও নেই আগের সেই মাছ ধরার। সারাদিন ঘরেই থাকতাম। শুয়ে বসে। রাত দশটা এগারোটার মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়তাম। ফজরের পর আবার ঘুম ঠিক বারোটা পর্যন্ত। আম্মা নাশতার জন্য কয়েকবার ডেকে চলে যেতেন। একদিন আমাদের কপালের ফুটোর মতোই চালের ফুটো দিয়ে বৃষ্টির পানি পড়ে তোষক জাজিম খাট সব ভেসে গেছে। আমার কোনো খবর নেই। জোহরের পর এসে শুয়ে শুয়ে বই পড়তাম। কিছুক্ষণের মধ্যে আবার ঘুমিয়ে যেতাম।

আছর এবং মাগরিবের পরের সময়টা কেটেছে আমাদের বাড়ির নূরানী এবং হাফেজী মাদ্রাসায়। মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা হয়েছে ১৯৯৮ এর দিকে। এখন শুধু ফজরের পরের মক্তব এবং স্কুল সিস্টেমের নূরানী চালু আছে। মাতবরের সংখ্যা অগণিত। একজন শিক্ষক এবং ইমাম এক বছর দূরে থাক ছয়মাস থাকতে পারেন না তাদের জ্বালায়।দেড়শ দুইশত টাকা বেতন দিতে খবর হয়ে যায় প্রবাসী পরিবারের। খাবার দাবারের ক্ষেত্রেও বেশ নিকৃষ্ট অবস্থান এ বাড়ীর মানুষদের। ভিক্ষার সম্মানজনক নিম্ন পরিমাণ দশ টাকার সময়ে এসেও হুজুরকে নাশতার জন্য বিশ টাকা দিয়েছে গেইট সাজিয়ে গরু জবাই করে মেয়ে বিয়ে দেয়া আমারই এক চাচা।

এখন একজন হুজুর আছেন। মসজিদের ইমাম মুয়াজ্জিন খাদেম তিনিই। বয়স বিশ একুশ হবে। গায়ে গতরে বড়সড় দেখতে। হিফজ শেষ করে মিযান পর্যন্ত পড়েছেন। তার চাচা মাওলানা আযীয সাহেব আগে এখানে পড়িয়েছেন। সেই সুত্রে তার আসা। বয়সে কাছাকাছি আমার চাচা ভাতিজা ভাই সহ অল্প মানুষের সঙ্গে আমার সখ্যতা। আছর থেকে এশা আমরা একসঙ্গে থাকি। টুকটাক গপসপ। খাওন দাওন।বিল এবং ফিসারির পাশ ধরে হাঁটা। একদিন আমরা মাদ্রাসায় চিকেন এন্ড ফিস বারবিকিউ করেছি।

রাতের খাবার একটু তাড়াতাড়ি খেলেও সকাল এবং দুপুরের খাবার খাওয়া হয়েছে আখেরি ওয়াক্তে। সকালের নাশতা দুপুর বারোটায়। দুপুরের খাবার আসরের আযান হলে। কোনদিন আসরের পর।এ খাওয়ার সময়টাই ছুটির সবচে আনন্দদায়ক সময়।আম্মার সঙ্গে গল্প করতাম। দীর্ঘ সময়। নানান বিষয়ে। আম্মা জীবনের ঘটনা দুর্ঘটনা সব শোনান। কী হয়েছে কী হচ্ছে? কী করেছেন? কী সয়েছেন? সব। পার করে আসা সীমাহীন দুখের দিনের কথা বলেন দীর্ঘ শ্বাস নিয়ে। তারপর আমাদের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা ভেবে হাঁপিয়ে ওঠেন।

ছুটির একদিন থাকতেই ঢাকা চলে এসেছি। কোনো কিছু রেখে আসার কিংবা ফেলে আসার কষ্ট আমাকে তাড়া করনি একটুও!

Picture of ওমর ফারুক
ওমর ফারুক
শিক্ষার্থী, উচ্চতর ফিকহ বিভাগ, ফিকরি ওয়াল ইরশাদ ঢাকা
লেখকের অন্যান্য লেখা

সূচিপত্র

সর্বাধিক পঠিত
উত্তম আখলাক: অনন্য ছয়টি মর্যাদা
ক্রোধ সংবরণ: কেন ও কিভাবে
দ্যা ফোরটি রুলস অফ লাভ: সুফিবাদের ইউটোপিয়া
হাদিস শাস্ত্রের প্রাচ্যবাদী বয়ান এবং মুসলিম সমাজে এর প্রভাব
ইয়াহইয়া সিনওয়ার: শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত লড়ে গেছেন যিনি
নারীর জীবনলক্ষ্য ও জীবন পরিকল্পনা