বীর শহীদ মুহাম্মদ দেইফের সম্মানিত স্ত্রীর সাক্ষাৎকার

আলকাসসাম ব্রিগেডের প্রধান মুহাম্মদ দেইফের স্ত্রী তাঁর শাহাদাত ঘোষণার পর প্রথমবারের মত কিছু তথ্য প্রকাশ করেছেন। গত ত্রিশ বছরে দখলদার ইসরাইলি বাহিনী দেইফকে বারবার হত্যার চেষ্টা করেছে। জায়নিস্টদের ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ হওয়ার পরও কিভাবে ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিলেন, কীভাবে রক্ষা পেলেন- আলজাযিরা নেটে প্রকাশিত বিশেষ সাক্ষাৎকারে এসবের বিবরণ দিয়েছেন দেইফের স্ত্রী গাদীর সিয়াম ‘উম্মে খালেদ’।

গোপনে বিয়ের আয়োজন

গাদীর সিয়াম ১৯৯৮ সালের স্মৃতিচারণ করে বলছিলেন, আমার মা ফাতেমা হালাবি ছিলেন একজন ফিলিস্তিনি সংগ্রামী নারী। তার আপন ভাই, যিনি শহীদ হয়েছিলেন, মায়ের কাছে একটি অস্ত্র লুকিয়ে রাখেন। মুহাম্মদ দেইফ সেই অস্ত্র নিতে গিয়ে মায়ের সাথে প্রথম পরিচিত হন।

২০০১ সালের গ্রীষ্মে দেইফ বিয়ে করেন গাদীরকে। বিয়ের পর গাদীর প্রবেশ করলেন জীবনের এক নতুন অধ্যায়ে। নিরাপত্তার বিচারে সেটা ছিল খুবই জটিল। কারণ দখলদার শক্তি তার স্বামীর পিছু ছাড়েনি মুহূর্তের জন্যও।

গাদীর নিজের নাম পালটিয়ে হয়ে গেলেন ‘মুনা’। পরিপূর্ণ গোপনীয়তা রক্ষা করে বিয়ে সম্পন্ন করার পর দেইফ ‘মানসুর’ নাম ধারণ করেন। তিনি যে নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন সেই পরিমণ্ডলে স্ত্রীর পরিচয় দেন ‘উম্মে ফাওযি’ নামে।

গাদীর বলেন, আমাদের বিয়েটা স্বাভাবিক ছিল না। মোহর বাবদ দেইফের কাছে ছিল মাত্র এক হাজার ডলার।  আনন্দ উদযাপনের কোন আয়োজনই ছিল না। আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে একটি ভেড়া জবাই করা হয় নিকটাত্মীয়দের জন্য। সেই বিয়ের দিন থেকে আমাদের কোন ঘর ছিল না। কোথাও স্থায়ী বসবাসের পরিবর্তে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় আমরা স্থানান্তরিত হতে থাকলাম।

দেইফের স্ত্রী স্বামীর দুনিয়াবিমুখতার প্রতিও ঈঙ্গিত করেছেন। তার ঘরে ছিল চারটি মেট্রেস, বেতের তৈরি একটি ম্যাট, দুজনের কাপড় রাখার জন্য প্লাস্টিকের একটি বক্স, এই হচ্ছে ঘরের সাকূল্য আসবাব। বিয়ে অনুষ্ঠান উপলক্ষে শায়েখ আহমদ ইয়াসীন যখন কিছু টাকা দিলে তিনি আলকাসসাম ব্রিগেডকে দান করে দেন। শহীদ সালাহ শাহহাদাও তাকে একটি বেডরুম দিয়েছিলেন, সেটাও অন্য এক তরুণকে উপহার দিয়ে দেন, যেন সে বিয়েটা সম্পন্ন করতে পারে।

গাদীর মানুষের কাছে বলতেন তার স্বামী একজন প্রবাসী। তিনি বলেন, ‘আমি যে ঘরে থাকতাম, অধিকাংশ সময় এর বাইরে গিয়ে স্বামীর সাথে সাক্ষাত করতে হতো। অনেক সময়ই এমন হয়েছে, কয়েক সপ্তাহ যাবত আমার সাথে তাঁর সাক্ষাত নেই, কোন যোগযোগও নেই। বিশেষত যখন নিরাপত্তা অবস্থার অবনতি ঘটত।‘

দেইফের স্ত্রীকে বহুবার জটিল নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। তাঁর দু চোখ বাঁধা হয়েছে, এক গাড়ি থেকে অন্য গাড়িতে, এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, যাতে তার স্বামীকে তিনি দেখতে পারেন।

প্রথম স্ত্রীর মায়ের পীড়াপীড়িতে ২০০৭ সালে দেইফ দ্বিতীয় বিয়ে করেন। কেননা সে সময় পর্যন্ত প্রথম স্ত্রীর গর্ভে কোন সন্তান হয় নি। দ্বিতীয় বিয়ের পর তার চার সন্তান জন্ম নেয়। এরপর আসে সেই বিশেষ মুহূর্ত যখন আলকাসসাম ব্রিগেডের প্রধান ভীষণ আনন্দিত হয়েছিলেন, তাঁর প্রথম স্ত্রী তিনটি জমজ বাচ্চা গর্ভধারণ করার কারণে।

বারবার হত্যাচেষ্টা

উম্মে খালেদ তার স্বামীকে দখলদার কর্তৃক বারবার হত্যা চেষ্টার বিবরণ দিয়েছেন। এর মধ্যে দু’বার তিনি আক্রান্ত হয়েছিলেন। প্রথমবার আহত হন ২০০২ সালের সেপ্টেম্বরে। গাজা সিটির ‘জালা রোডে’ তার গাড়ি টার্গেট করেছিল ইসরাইলি বাহিনী। এই হামলার পর তিনি বাম চোখ হারান। দ্বিতীয় আক্রমণ ছিল ২০০৬ সালে, একটি বাড়িতে। এতে তার শরীর ভয়াবহ রকম দগ্ধ হয়। পিঠেও অনেকগুলো হাড়ে ভাঙ্গা দেখা দেয়। যার জন্য হাঁটতে সমস্যা সৃষ্টি হয়েছিল তাঁর।

স্বামী আহত হওয়ার পর উম্মে খালেদ প্রাথমিক নার্সিং শিখেছেন। তিনিই দেইফের বিশেষ নার্স হয়েছিলেন। চিকিতসা সেবা, সময় মতো ঔষধ খাওয়ানো ও ইঞ্জেকশন দেয়ার মতো কাজগুলো তিনি সম্পন্ন করতেন।

২০১৪ সালে আলকাসসাম ব্রিগেড প্রধান তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী ও দুই সন্তানকে হারিয়েছেন। সেসময় তারা অবস্থান করছিলেন একটি বাড়িতে, যেখানে ইসরাইলি বাহিনী বিমান  হামলা চালায়। 

উম্মে খালেদ জানান, ইসলামিক ইউনিভার্সিটি গাজা থেকে  বায়োলোজির উপর ব্যাচলর ডিগ্রি গ্রহণ করেছিলেন দেইফ। তিনি তাকে পড়াশোনা সম্পন্ন করতে উতসাহিত করেছেন। কিন্তু উম্মে খালেদ উচ্চ মাধ্যমিকের পরীক্ষা দিতে গিয়ে ইংলিশ সাব্জেক্ট নিয়ে মুশকিলে পড়ে যান। দেইফ তখন পরীক্ষায় পাশ করার জন্য একটি প্ল্যান তৈরি করে দেন। যার নাম রাখেন ‘সাফল্যের রোডম্যাপ’। প্রশ্নোত্তরের একটি গাইডও তাকে দিয়েছিলেন।

পারিবারিক যাবতীয় আয়োজন-অনুষ্ঠান-অনুষঙ্গ থেকে সবসময় দূরে ছিলেন দেইফ। দ্বিতীয় স্ত্রী ও তার দুই সন্তানের কাফনদাফনে অংশ নিতে পারেন নি। হাজির হতে পারেন নি বছর কয়েক আগে মারা যাওয়া বাবা মায়ের শোক-অনুষ্ঠানেও। তার সন্তানদের কারো জন্মের সময়ও কাছে ছিলেন না, যেমন বাবারা সাধারণত কাছে থাকেন।

উম্মে খালেদের ভাষ্য, ‘দেইফ সন্তানদের আনন্দিত করতে বিশেষ সুযোগ খুঁজতেন। তাদের থেকে তিনি দূরে থাকেন, এর কিছুটা বিনিময় দেয়ার চেষ্টা থাকতো তাঁর।

দেইফের স্ত্রী জানিয়েছেন, কোন কোন সময় তার স্বামী পঞ্চাশদিনেরও বেশি পরিবার থেকে দূরে থাকতেন। নিরাপত্তা হুমকি বেড়ে গেলে এমনটা হতো। উম্মে খালেদ নিশ্চিত করেছেন, ‘আবু খালেদ (দেইফ) অন্য কারো পরিচয় ধারণ করেন নি, যেমনটি দখলদাররা ছড়িয়ে থাকে, তাঁর দেহ-কাঠামোতেও পরিবর্তন ঘটাননি তিনি।‘

দেইফ সন্তানদের অসিয়ত করেছেন কুরআনে কারীম হিফজ করার জন্য। আলকাসসাম ব্রিগেডের সদস্যদের জন্যও এমন প্রকল্প দেখাশোনা করতেন। কুরআন হিফজ সম্পন্ন করা, কুরআনের মর্ম উপলব্ধি করা ও আমল করার ক্ষেত্রে যেন প্রতিযোগিতা করে, এব্যাপারে তিনি তাদের উতসাহিত করতেন।

যুগান্তকারি মুহূর্ত

উম্মে খালেদ বলছিলেন দেইফের জীবনে যুগান্তকারি মুহূর্তের কথা। স্মৃতিচারণ করছিলেন তার স্বামীর জীবনের সবচে বেদনাদায়ক মুহূর্তেটির, যখন দখলদার ইহুদী সৈন্যরা মসজিদে আকসা প্রাঙ্গনে অবস্থানরত প্রতিরোধকারি নারীদের ছত্রভঙ্গ করে দিয়েছিল! সে সময় ফিলিস্তিনি জনগণ স্লোগান দিয়েছিল,

حط السيف قبال السيف + احنا رجال محمد الضيف

 ‘তরবারির মুখে রাখো তরবারি, আমরা মুহাম্মদ দেইফের বাহিনী’!

তখন থেকে দেইফ প্রায়ই অনুভব করতেন, ভীষণ ভারী এক দায়িত্বের মুখোমুখি তিনি!

আরেকবারও দেইফ অনেক ব্যাথিত হয়েছিলেন! সেটা ছিল ২০০৩ সনের গ্রীষ্মকাল। আলকাসসামের গুরুত্বপূর্ণ নেতা ইয়াসীর ত্বহা যখন শাহাদাত বরণ করেন।

বিপরীতে আবু খালেদকে তার স্ত্রী এত বেশি আনন্দিত দেখেননি, যতটা আনন্দিত দেখেছেন ২০১১ সনে বন্দিবিনিময়ের সময়ে। ইহুদীদের কারাগারে থাকা এই বন্দীরা মুক্তি পেয়েছিলেন ‘ওয়াফাউল আহরার’ বা ‘স্বাধীনদের দায়পূরণ’ নামক চুক্তির ভিত্তিতে। সেদিন তিনি বলেছিলেন, ‘আজ কিছু মৃত মানুষকে সঞ্জীবিত করতে পারলাম আমরা!’

উম্মে খালেদ জানিয়েছেন, দেইফের জীবনে কোন বিলাসিতা ছিল না। প্রচলিত ও সহজে পাওয়া যায় এমন খাবারই তিনি খেতেন। তার খাবার তালিকায় থাকত মুলোখিয়া (শাক বিশেষ), শিম, ঢেঁড়স ও রুমানিয়া (আনার মিশ্রিত খাবার বিশেষ)। ‘মুজাদ্দারা’ (খিচুড়ি বিশেষ) রান্না করতে তিনি পারদর্শি ছিলেন।

দরিদ্রদের সেবার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন দেইফ। নানাবিধ ব্যস্ততা সত্ত্বেও ক্যান্সার আক্রান্ত দরিদ্র এক মহিলার দেখভাল করেছিলেন তিনি নিজে। এমনকি সেই মহিলা বিদেশেও চিকিতসা সম্পন্ন  করেছে। মাসিক বেতনের বড় অংশটি তিনি অভাবিদের জন্য বরাদ্দ করে রাখতেন। আলকাসসাম ব্রিগেডের অর্থায়নে দরিদ্র সাধারণ মানুষের ২৭০টি ঘর এক বছরের মধ্যে সংস্কার কার্যক্রমের তত্ত্বাবধানও করেছেন। সেই আবু খালেদ দুনিয়া থেকে বিদায় নেয়ার সময় তার কোন ঘর ছিল না, বলছিলেন তার স্ত্রী।

জিহাদের পথে যাত্রার বিবরণ

আলকাসসাম ব্রিগেড প্রধান দেইফের পরিবার বসবাস করেন একটি শরণার্থি কেন্দ্রে। যেমন উচ্ছেদের শিকার হওয়া হাজার হাজার ফিলিস্তিনি পরিবার ঘরবাড়ি হারিয়ে এখানে বসবাস করছেন। উম্মে খালেদের সাথে দেইফের সর্বশেষ সাক্ষাত হয়েছিল ‘তুফানুল আকসা’ অপারেশন শুরু হওয়ার কয়েক ঘন্টা আগে, ২০২৩ সালের ০৬ই অক্টোবর। তিনি বলেছিলেন, ‘আসরা (ইসরাইলি কারাগারে বন্দী) ও মাসরা (নবীজি যেখানে মি’রাজের রাতে এসেছিলেন)’র পথে আমাদের দায়িত্ব আদায় করতেই হবে।‘

দেইফের আকাঙ্খা ছিল ‘মসজিদে আকসা’ মুক্ত করার ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হবেন। এবং পবিত্র নগরীতে থাকার জন্য তৈরি করবেন একটি ঘর।

ফিলিস্তিনি জনগন যতধরণের কষ্ট ভোগ করেছে, দেইফ তার সবটাই করেছেন। বন্দীত্ব, জখম, স্ত্রী সন্তানদের বিয়োগ, তারপর শাহাদাত, সবকিছু! বলছিলেন উম্মে খালেদ।

জিহাদের পথে দেইফের এই পথচলা তার স্ত্রী অবলোকন করেছেন দীর্ঘ কাল যাবত এবং সংরক্ষিত করেছেন। তিনি ‘ছায়া’র অনেক বিষয়ে তার সাথে সংলাপও করতেন, যা জনসম্মুখে প্রকাশ্য ছিল না। অল্পকিছুদিনের মধ্যে উম্মে খালেদ এসব উন্মোচন করবেন একটি বইয়ে, যে বই বর্ণনা করবে দীর্ঘ ত্রিশ বছরের প্রতিরোধ সংগ্রামের আখ্যান।  

(আলজাযিরায় প্রকাশিত সাক্ষাতকার অবলম্বনে লিখেছেন আনাস চৌধুরী। আলকাউসার নারী সংখ্যায় প্রকাশিত। )

শেয়ার করুন

image_print
Picture of আনাস চৌধুরী
আনাস চৌধুরী
আনাস চৌধুরীর জন্ম নব্বইয়ের শেষ দিকে, হবিগঞ্জ সদরে। পড়াশোনা করেছেন ঢাকার জামিয়াতুল উলুমিল ইসলামিয়াতে। পরবর্তিতে দারুল উলুম দেওবন্দেও অধ্যয়ন করেছেন এক বছর। পেশায় তিনি একজন শিক্ষক, হবিগঞ্জের দারুল ইরশাদ বহুলা মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করছেন। লেখালেখি, অনুবাদ ও দ্বীনি আলোচনাতেও তার অংশগ্রহণ রয়েছে। বাংলা ও আরবীতে অনুবাদ করেছেন বেশ কিছু বই। ইতিমধ্যে কয়েকটি প্রকাশিত হয়েছে।
লেখকের অন্যান্য লেখা

সূচিপত্র

সর্বাধিক পঠিত
উত্তম আখলাক: অনন্য ছয়টি মর্যাদা
হাদিস শাস্ত্রের প্রাচ্যবাদী বয়ান এবং মুসলিম সমাজে এর প্রভাব
নকল মূদ্রা: শব্দের খোলসে মতাদর্শ ~ আব্দুল্লাহ আন্দালুসি
দ্যা ফোরটি রুলস অফ লাভ: সুফিবাদের ইউটোপিয়া
ইয়াহইয়া সিনওয়ার: শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত লড়ে গেছেন যিনি
পরামর্শ বা মাশওয়ারা: ইসলামের অনুপম এক নির্দেশনা