ঘুমের মধ্যে মানুষ মূলত আরামদায়ক নরম একটি মৃত্যুর অভিজ্ঞতা লাভ করে। যাত্রাটি শুরু হয় তন্দ্রা থেকে। এ সময় পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়ে কোমল এক নিস্ক্রিয়তা। এরপর কোথায় কোন অচিনপুরে হারিয়ে যায়। সমুদ্রের জলরাশিতে ভাসমান একটি জাহাজের মতো, কাউকে কিছু না বলে চুপচাপ হারিয়ে গেছে সমুদ্রের গহীন অন্ধকারে। ইচ্ছাশক্তি কাজ করে না। কোন অঙ্গের উপর সামান্য নিয়ন্ত্রণ থাকে না। বোধশক্তি নেমে আসে প্রায় শূন্যের কোঠায়।
এ অবস্থায় যখন কাউকে ডাকা হয়, তখন অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি প্রক্রিয়ায় তার অনুভূতি ফিরে আসে। বলা যায়, জাগ্রত হওয়া মানে প্রায় শূন্য অবস্থা থেকে মৃত একজন মানুষ জীবন ও চেতনায় প্রত্যাবর্তিত হওয়া।
প্রায় প্রতিদিন আমরা কাউকে না কাউকে জাগানোর দায়িত্ব পালন করি। বাহ্যত বিষয়টি ছোট; কিন্তু এই ছোট কাজটি করতে গিয়েই অনেক সময় গলদঘর্ম হতে হয়। বিশেষ করে পরিবারে সম্মানিত নারীগণ সন্তানদের জাগাতে গিয়ে অসুবিধাটির মুখোমুখি হন সবচেয়ে বেশি। কোনো কোনো পরিবারে বিষয়টি রীতিমতো বিভীষিকা রূপে হাজির হয়।
ছোট হওয়া সত্তেও কাজটি এমন জটিল আকার ধারণ করার পেছনে অন্তর্নিহিত একটি কারণ আছে। সন্তানদেরকে জাগ্রত হওয়ার স্পর্শকাতর মুহুর্তটি নিরাপদে পার করিয়ে আনতে চাইলে প্রথমেই আমাদেরকে জানতে হবে অন্তর্নিহিত সেই কারণটি কী। অতপর হৃদয়ের মমতা মিশিয়ে প্রয়োগ বিশেষ কিছু কৌশল ও উপায়। তাহলেই আমরা আমাদের সন্তানদেরকে জাগিয়ে তুলতে পারব খুব সহজে এবং নিতান্ত আনন্দের সাথে।
প্রশ্ন হলো, সেই অন্তর্নিহিত কারণটি কী? এটি বুঝতে হলে আমাদেরকে ‘মানুষের ঘুম ভাঙতে দেরি হয় কেন?’—এই প্রশ্নের উত্তরটি জানতে হবে।
ঘুম না ভাঙ্গার কারণ
ডাক দেওয়ার পরও ঘুম না ভাঙ্গার জন্য প্রধাণত দুটো বিষয়কে দায়ী করা যায়। একটা শারিরিক, অপরটি মানসিক।
১. শারিরিক কারণ: গত সংখ্যায় আমরা বিস্তারিতভাবে আলোচনা করেছি, তন্দ্রাচ্ছন্নতা থেকে শুরু করে সমাপ্তি পর্যন্ত ঘুমের ভিতর মানুষ একে একে মোট চারটি ধাপ অতিক্রম করে। প্রথম ধাপে ঘুম থাকে খুবই হালকা। একে বলা যায় অনেকটা ঘুম ও জাগরণের মাঝামাঝি অবস্থা। এ সময় জাগানোটা খুবই সহজ। সামান্য ডাক দিলেই উঠে যায়। এমনকি সে যে ঘুমিয়েছে অনেক সময় এটাই স্বীকার করতে চায় না।
এরপরের ধাপটি হলো গভীর ঘুমের পূর্ব অবস্থা। এ সময় মানুষ ধীরে ধীরে গহীন সমুদ্রে ডুবে যেতে থাকে। তবে, এই স্তরে জাগানোও তুলনামূলক সহজ।
কিন্তু এরপরই আসে তৃতীয় স্তরটি। মানুষ গভীর এক অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়। তার চেতনা লোপ পায়। পুরো দমে চলতে থাকে মস্তিষ্কের বর্জ্য নিষ্কাশন, ক্ষতিগ্রস্ত অংশগুলোর পুনর্গঠন ও শরীরের সব জায়গায় মেরামতের কাজ। আমরা তখন বলতে গেলে মৃত্যু বরণ করি। যার কারণে কাউকে এই স্তর থেকে জাগিয়ে তোলাটা সবচেয়ে কঠিন। কারণ, সে তখন এমন একটি অবস্থায় থাকে, যখন বাইরের ডাক বা স্পর্শ কোনো কিছুই সহজে টের পায় না।
এর পরই আসে চতুর্থ স্তর। মানুষ তখন রহস্যময় এক স্বপ্নের জগতে ঢুকে পড়ে। মহান আল্লাহ তার অসীম কুদরত দিয়ে পুরো শরীরকে প্যারালাইজড বা সম্পূর্ণরূপে অবশ করে দেন। তবে, তার মস্তিষ্ক তখন ভীষণ সজাগ ও সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং ব্যস্ত হয়ে পড়ে স্মৃতির বিন্যাস, স্বপ্ন তৈরী, আবেগ উন্নত করণসহ নানা কাজে। ফলে এই অবস্থা থেকে জাগানোটাও বেশ কঠিন।
চারটি স্তর শেষ হওয়ার পর আবার নতুন করে শুরু হয় প্রথম স্তর থেকে। সারারাত ঘুমের চক্রটি এমন করেই আবর্তিত হয়। তবে, সময় যত সামনে এগোয়, চক্র তত ছোট হয় এবং তৃতীয় ও চতুর্থ স্তরের গভীরতাও সমপরিমাণে কমে আসে।
সুতরাং, ঘুমন্ত মানুষটি কত সহজে জাগ্রত হবে, এটা অনেকাংশে নির্ভর করে সে তখন কোন চক্রের কোন স্তরে অবস্থান করছে তার উপর। কেউ যদি শুরুর রাতে ঘুমিয়ে পড়ে তাহলে শেষ রাতে স্বাভাবিকভাবেই তার ঘুম হালকা হয়ে আসবে এবং সামান্য ডাকেই উঠে পড়তে সক্ষম হবে।
অতএব, ফজরের সময় সন্তানকে সহজে ঘুম থেকে জাগাতে হলে প্রথম রাত্রে তাকে অবশ্যই দ্রুত ঘুম পাড়িয়ে দিতে হবে। কিন্তু তা না করে সন্তান যদি ঘুমাতেই যায় রাত একটা কি দেড়টার সময়, তাহলে ফজরের সময় সে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন থাকবে। তখন যতই ডাকা হোক, রাগ করা হোক কিংবা ভয় দেখানো হোক, সহজে উঠতে চাইবে না। তাই আমাদের পরিশ্রমটা ঘুম থেকে জাগানোর পেছনে ব্যয় না করে সন্তানদেরকে সঠিক সময়ে ঘুম পাড়ানোর কাজে ব্যয় করাই বুদ্ধিমানে কাজ হবে। আশা করা যায়, এতে অনেক ভালো একটি ফলাফল পাওয়া যাবে।

২. মানসিক কারণ: একজন মানুষ ঘুম থেকে সহজে জাগবে কি না—এটি আরো একটি বিষয়ের উপর নির্ভর করে। তা হলো জাগ্রত হওয়াটাকে সে কতটুকু গুরুত্ব দিচ্ছে? বাস্তব অভিজ্ঞতায় দেখা যায়—যাকে ফজরের জন্য তোলা যায় না, সে মানুষটি কক্সবাজার বেড়াতে যাওয়ার দিন সামান্য ডাক দিলেই ধরফর করে উঠে বসে।
এমনিভাবে ঘুম থেকে জাগতে দেরি হলে তাকে যদি শাস্তির মুখোমুখি হতে হয় তখনও একই কাণ্ড ঘটতে দেখি। সামান্য শব্দ পেলেই বা শাস্তিদাতা মানুষটি গিয়ে একটু ডাক দিলেই চট করে ওঠে বসে। এসব ক্ষেত্রে এমনকি ঘুমের তৃতীয় বা চতুর্থ স্তরের গভীরতাও কোনো ধরণের বাধা সৃষ্টি করতে পারে না।
এর পেছনে কাজ করে মূলত তার বিশেষ ধরণের একটি মানসিক অবস্থা। ঘুম থেকে জাগলে যদি আনন্দায়ক কিছু পাওয়া যায়, তাহলে ঘুমানোর আগেই তার ভিতরে অদৃশ্য একটি এলার্ম সেট হয়ে যায়। সঠিক সময়ে নিজের থেকেই তা বেজে ওঠে। এ কারণে দেখা যায়, এমন দিনে ঘুম কাতুরে ছেলেটিও সবার আগে ওঠে বসে থাকে।
এ জায়গাটিতে আমাদের কাজ করতে হবে। যে কাজের জন্য তাকে ডাকা হচ্ছে, সে কাজটির গুরুত্ব তাকে বুঝাতে হবে। সে কাজটির প্রতি তাকে লোভাতুর করে তুলতে হবে।
সমাধান
অতএব, কোনো সন্তান যদি ঘুম থেকে জাগতে দেরি করে, তাহলে তাকে জোরজবরদস্তি করা, বিরক্তির সাথে বার বার ডাকতে থাকা, রাগ প্রকাশ করা কিংবা প্রহার করা একমাত্র সমাধান নয়। বরং, তার ঘুম ভাঙতে কেন দেরি হয়, সে কারণগুলো খুঁজে বের করা খুব জরুরী।
যদি দেখা যায় সে ঘুমাতে যায় দেরি করে, তাহলে এর সমাধান করতে হবে। পাশাপাশি জাগতে দেরি হওয়ার কারণে মায়ের কী পরিমাণ কষ্ট হয়, ফ্যামিলিতে কী কী সমস্যা হচ্ছে, তার নিজের কী ক্ষতি—এ বিষয়গুলো স্নেহের সাথে বুঝিয়ে বলতে হবে। বুঝিয়ে বলতে হবে দ্রুত জাগলে তার কী কী লাভ হবে সে বিষয়গুলোও। নামাজ, পড়ালেখা বা কাজের প্রতিও তার ভিতরে জাগিয়ে তুলতে হবে আন্তরিক আগ্রহ ও আকর্ষণ।
এতে করে সে ঘুমাতে যাওয়ার আগেই জাগ্রত হওয়ার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকবে। ব্যাকুল হবে। এমনকি এক সময় আল্লাহ তাআলা তাকে সঠিক সময়ে নিজে নিজে জাগ্রত হওয়ার তাওফিকও দান করবেন।
বিশেষ কিছু কৌশল
১. অন্ধকার দূর করুন: জানালার পর্দা সরিয়ে বা লাইট জ্বালিয়ে প্রথমেই অন্ধকার দূর করে দিন। কারণ, আলোর উপস্থিতি চোখের রেটিনার মাধ্যমে মস্তিষ্কে পৌঁছায়। এতে ঘুমিয়ে থাকতে সাহায্যকারী মেলাটনিন নামক হরমোনের নিঃসরণ বন্ধ হয়ে আসে। শরীরের ভিতরে আল্লাহ তাআলা যে প্রাকৃতিক ঘড়ি সৃষ্টি করে দিয়েছেন, আলো পেলে সে ঘড়িটিও জেগে ওঠার বার্তা তৈরী করে। যার ফলে আমাদের শরীর সচল ও সচেতন হওয়ার দিকে ফিরতে শুরু করে। জেগে ওঠার পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়।
২. নাম ধরে ডাক দিন: নাম ধরে নিম্ন স্বরে ডাকুন বা কোনো কিছুতে হালকা শব্দ করুন। ধীরে ধীরে আওয়াজের পরিমাণ বাড়ান। এতে হালকা ঘুম হলে সে জেগে যাবে। আর ভারী ঘুমে থাকলে হালকা স্তরের দিকে ফিরে আসার সুযোগ পাবে। সবচেয়ে ভালো হলো, মমতার সাথে নাম ধরে ডাকা। এতে তার মস্তিষ্ক দ্রুত সাড়া দেয়। মানসিকভাবে এক ধরণের শান্তি ও নিরাপত্তা অনুভব করবে। দ্রুত ওঠার জন্য এটা খুবই সহায়ক।
৩. হাত দিয়ে মৃদু নাড়া দিন: এ পর্যায়েও যদি না জাগে, তাহলে কপালে, মাথার চুলে বা পায়ের তলায় কোমলভাবে হাত বুলিয়ে স্নেহের সুরে ডাকুন। ঘুমের জগতে মানুষের হার্টবিট কম থাকে, রক্ত সঞ্চালন ধীর হয়, চতুর্থ স্তরে থাকলে তো রীতিমতো প্যারালাইজড হয়ে পড়ে। যার কারণে মানুষ ঘুমের জগত থেকে বাস্তবে ফিরে আসার মুহূর্তে মানসিকভাবে কিছুটা অরক্ষিত অনুভব করে। ফলে, সচেতন স্তরে এসে পুরোপুরি সক্রিয় হতে কিছুটা সময় প্রয়োজন। এ সময় মমতা ও নিরাপত্তার অনুভূতি ঘুম থেকে সহজে জাগ্রত হওয়ার জন্য টনিকের মতো কাজ করে।
৪. কয়েক বারে জাগান: কারো ঘুম ভাঙতে যদি দেরি হয়, তাহলে তাকে প্রথমবারেই পুরোপুরি জাগানোর চেষ্টা না করে কাজটা কয়েকবারে করা ভালো। এতে একদিকে যেমন তার শরীরে সচেতনতা ও সক্রিয়তা একটি সহনীয় মাত্রায় ধীরে ধীরে ফিরে আসার সুযোগ পায়, অপরদিকে এটি তাকে মানসিকভাবেও স্বচ্ছন্দ দান করে। প্রথম বার ডাকার সময় তার ভিতরে ঘুম ছেড়ে ওঠার যে আলসেমি ও কষ্ট দেখা দেয়, পাঁচ দশ মিনিটের ছোট্ট একটি বিরতি সেটা কাটিয়ে ওঠতে সাহায্য করে। ঘুমন্ত ব্যক্তিটিও ডাকনেওয়ালার প্রতি এক ধরণের কৃতজ্ঞতা বোধ করে। কারণ, সে সময় ঘুমানোর জন্য দু তিন মিনিট সময় পাওয়া তার জন্য বিরাট আনন্দের বিষয়। এটা তখন ঘুম থেকে জাগ্রত হতে না চাওয়ার জেদ কমিয়ে তাকে শান্ত করে তোলে। ফলে পরবর্তী ডাকের সময় সে সহজেই ওঠে বসে।
৫. ভেজা হাত বুলিয়ে দিন: এই পর্যায়ে এসেও যদি না জাগে, তাহলে তার কপাল ও চোখের পাতায় খুব কোমলভাবে ভেজা হাত বুলিয়ে দিন। এটা তাকে দ্রুত চেতনার স্তরে নিয়ে আসবে এবং শরীরকে সক্রিয় করে তুলবে।
তবে, জোরালোভাবে পানির ঝাপটা দেওয়া বা দূর থেকে পানি ছুঁড়ে মারা উচিত নয়। এতে হিতে বিপরীত হতে পারে। কারণ, সে তখন আতঙ্কিত বা বিরক্ত হয়ে ‘স্বয়ংক্রিয় আত্মরক্ষা’র অবস্থানে চলে যেতে পারে। তখন তাকে জাগানো আরো কঠিন হয়ে পড়বে, কিংবা জাগলেও বিরক্তি, আতঙ্ক ও বিষণ্ণতায় আক্রান্ত হতে পারে।
হাদীস শরীফে এসেছে, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তার উপর রহম করুন, যে রাতের বেলা জাগ্রত হয়, এরপর সালাত আদায় করে, অতঃপর নিজের স্ত্রীকে জাগিয়ে দেয়। এ সময় স্ত্রী যদি উঠতে না চায়, তখন সে তার চেহারায় পানি ছিটিয়ে দেয়।
এমনিভাবে সে নারীর উপরও আল্লাহর রহমত বর্ষিত হোক, যে রাতের বেলা জাগ্রত হয়, সালাত আদায় করে, অতঃপর নিজের স্বামীকে জাগিয়ে দেয়। যদি উঠতে না চায় তখন তার চেহারায় পানি ছিটিয়ে দেয়। (আবু দাউদ)।
মূলকথা এই—একজন ঘুমন্ত মানুষ মূলত চূড়ান্ত পর্যায়ের অসহায় মানুষ। তাকে জাগানোর জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরী করা এবং মমতার সাথে কোমলভাবে তাকে সে অসহায়ত্ব থেকে নিরাপদে বের করে আনাটা আমাদের একান্ত কর্তব্য।
সেটা না করে আমরা যদি একবারেই জাগাতে চাই, রুঢ়তার সাথে জোরালো শব্দ করি বা জোরে ধাক্কা দিয়ে সজাগ করতে চাই, এটা একদিকে যেমন আমাদের জন্য সীমাহীন কষ্ট দেয়, বিরক্তি তৈরী করে, এমনকি সন্তানের সাথে সম্পর্ক পর্যন্ত খারাপ হয়, অপরদিকে তা ঘুমন্ত সন্তানের জন্যও বিপদের কারণ হতে পারে।
তীব্রভাবে জাগানোর বিপদ
আমরা অনেক সময় কয়েক বার ডাক দিয়ে ওঠানো না গেলে জোরে জোরে ধাক্কা দিতে থাকি, অত্যাধিক উচ্চ আওয়াজে ডাকতে থাকি কিংবা তিরস্কার ও হুমকি ধামকি দিতে থাকি। কিন্তু আমাদেরকে মনে রাখতে হবে, ঘুমন্ত অবস্থায় আমাদের হার্ট রেট এবং রক্তচাপ বেশ কম থাকে। হুট করে প্রচণ্ড ভীতি বা ধাক্কা দিয়ে জাগালে রক্তচাপ ও হার্টবিট মুহূর্তের মধ্যে অনেক বেড়ে যায়। বিশেষ করে যদি ব্যক্তিটি ঘুমের গভীর স্তরে থাকেন, তখন এর প্রভাব শরীরের ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
গভীর ঘুম থেকে আকস্মিক জাগলে মস্তিষ্ক পুরোপুরি সক্রিয় হতে কয়েক সেকেন্ড থেকে কয়েক মিনিট সময় নেয়। এই অবস্থায় মানুষ কী করছে বা কোথায় আছে তা বুঝতে পারে না। এর ফলে সে ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে গিয়ে চোট পেতে পারে, ভয়ংকর চেহারা করে ডাকনেওয়ালাকে ভয় দেখাতে পারে, ঝগড়া শুরু করতে পারে, এমনকি আক্রমণও করে বসতে পারে।
তাছাড়া এমনভাবে জাগালে ঘুমের ব্যাপারে তার মনে একধরণের আতঙ্ক তৈরী হতে পারে, যা পরবর্তীতে তার ঘুমের গুণগতমান কমিয়ে দিবে। ঠিকমতো জাগতে না পারলে লজ্জার মুখে পড়তে হবে, এমন ভয় আমাদের ঘুমকে নষ্ট করে দেয়—এ সত্যটি আমরা বাস্তব জীবনে নানা সময়ে উপলব্ধি করেছি।
এমনিভাবে সে যদি চতুর্থ স্তরে প্যারালাইজড অবস্থায় থাকে, তখন এমন হতে পারে, হঠাৎ ধাক্কা বা তীব্র আওয়াজে তার মস্তিষ্ক জেগে যাবে, কিন্তু শরীর জাগতে কিছুটা সময় নিবে। এই সমন্বয়হীনতার কারণে তখন সে কিছু সময়ের জন্য ভয়াবহ একটি জীবন্মৃত অবস্থায় ঢুকে পড়তে পারে। এই অবস্থাটি মানুষের জন্য খুবই কষ্টদায়ক, একই সাথে ভয়ংকর অভিজ্ঞতাও বটে।
সাড়া দিয়েও বিছানা না ছাড়ার কারণ
কখনো এমন হয় ডাকলে সাড়া দিচ্ছে, এমনকি আপনার কথা বুঝতেও পারছে, কিন্তু শরীর নড়াচড়া করছে না বা বিছানা ছাড়ছে না। এটি আমাদের জীবনের খুব পরিচিত একটি দৃশ্য। এই আধো-ঘুমের ভিতরে একগুঁয়েমির পেছনে শারীরিক এবং মনস্তাত্ত্বিক—উভয় কারণই দায়ী।
ঘুম থেকে জাগ্রত হওয়ার পর শরীর পুরোপুরি সক্রিয় ও স্বাভাবিক হতে কিছুটা সময়ের প্রয়োজন হয়। মস্তিষ্ক যৌক্তিক চিন্তা ভাবনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর্যায়ে যেতেও খানিকটা দেরি হয়। সে সময় মূলত আমাদের ভিতরে ঘুমের রেশ থেকে যায়। সেই সাথে আমাদের অবচেতন মন ঘুম থেকে জাগ্রত হওয়াকে একটি কষ্টদায়ক কাজ হিসেবে চিহ্নিত করে। যার ফলে বার বার আরামাদায়ক ঘুমের কাছে ফিরে যেতে চায়।
আধো-ঘুমের অবস্থায় মানুষের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও কমে যায় অনেক দূর পর্যন্ত। ফলে তার যে এখনই ওঠা দরকার—এই ছোট সিদ্ধান্তটি নিতেও অনেক বেগ পেতে হয়। তার কাছে মনে হয় এর চেয়ে সহজ হলো শুয়ে থাকা।
এর মধ্যে জাগানোর পদ্ধতিটা যদি কোমলভাবে না হয়ে রূঢ়ভাবে হয়, তখন সে এটাকে তার বিরুদ্ধে একটি আক্রমণ ও স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ বলে মনে করে। পাশাপাশি সেই আধো ঘুমের অবস্থায় মানুষের যুক্তিবোধ, শিষ্টাচারনীতি ও আবেগ নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতাও খুবই দুর্বল অবস্থায় থাকে।
ফলে কে ডাকছে, কেন ডাকছে, উঠলে তার কী লাভ হবে—এসব বিচার বিবেচনায় যেতে পারে না। বরং, ঘুমের ঘোরে মস্তিষ্ক কেবল এটুকুই বোঝে যে কেউ একজন তার শান্তি নষ্ট করছে। তখন মস্তিষ্ক আত্মরক্ষামূলক অবস্থানে গিয়ে অবচেতনভাবে একটি জেদ ও প্রতিরোধে বন্দি হয়ে পড়ে। যে ডাক দিচ্ছে তাকে ধমক দেয়, খারাপ আচরণ করে, কখনো সরাসরি বলে বসে—আমি ওঠব না। কিন্তু ঘুম থেকে ওঠার পর সে এসবের কিছুই মনে করতে পারে না।
কারণ, এই ব্যাপারগুলো তার সচেতন অবস্থায় ঘটেনি। ঘটেছে ঘুমের ঘোরে, অসতর্ক অবস্থায়। কিন্তু যিনি ডাকছেন, তিনি খুবই বিরক্ত হন, আহত হন, রাগান্বিত হন, প্রহার করেন, কখনো এই ব্যাপারটি সন্তানদের সাথে সম্পর্কের মধ্যেও টানাপোড়ন সৃষ্টি করে।
রাগ ও তার উৎস
কিছু সময় ডাকার পর আমরা অনেক সময় রাগ করে বসি। এই রাগের উৎস হলো এই যে, আমরা সজাগ আছি, ফলে ভালোভাবে বুঝতে পারি ঘুমন্ত মানুষটার জেগে ওটা এখন কতটা দরকার এবং ঘুমিয়ে থাকা কতটা ক্ষতিকর। কিন্তু সে এসবের কিছুই বুঝে না।
ফলে ঘুমন্ত মানুষের সাথে রাগ করার কোনো অর্থ নেই। সে সময় তো তার কোন ইচ্ছাশক্তি থাকে না, কোন অঙ্গের উপর তার সামান্য নিয়ন্ত্রণ থাকে না এবং বোধশক্তিও নাই হয়ে যায়। ফলে, সজাগ মানুষের মতো এতো কিছু চিন্তা করার শক্তি তার থাকে না। একজন ঘুমন্ত ব্যক্তি সত্যিকার অর্থে নিতান্ত অসহায় একজন মানুষ।
এ কারণে শরীয়তের পক্ষ থেকেও ঘুমন্ত মানুষের উপর থেকে সব রকমের দায় উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে। হাদীসে বলা হয়েছে : তিন শ্রেণির মানুষের ওপর থেকে (গুনাহ বা জবাবদিহিতার) কলম তুলে নেওয়া হয়েছে: ১. নাবালেগ শিশু, যতক্ষণ না সে প্রাপ্তবয়স্ক হয়; ২. ঘুমন্ত ব্যক্তি, যতক্ষণ না সে জাগ্রত হয় এবং ৩. অপ্রকৃতিস্থ বা ভারসাম্যহীন ব্যক্তি, যতক্ষণ না সে সুস্থতা লাভ করে। (আবু দাউদ, তিরমিজি, ইবনে মাজাহ, আহমদ)।
আমাদের রাগের আরেকটি উৎস হলো ঘুমন্ত মানুষটির প্রতি আমাদের পূর্ব ক্ষোভ। সে হয়তো সময় মতো ঘুমায় না, বার বার বলার পরও স্বাস্থ্যসম্মত চলাফেরা করে না, পড়ালেখা বা নামাজের প্রতি গাফিলতি করে—এসব কারণে আমরা তার প্রতি বিরক্ত হয়ে থাকি। এরপর যখন ঘুম থেকে উঠতে দেরি করে, তখন সেই বিরক্তিটা ধীরে ধীরে ক্ষোভে পরিণত হয়। তখন রেগে যাই।
কিন্তু মনে রাখতে হবে, ঘুমন্ত অবস্থায় এসব কারণে রাগ দেখিয়ে লাভ নেই। এ সবের জন্য রাগ দেখানো, শাসন করা বা আদর করে বুঝিয়ে বলাটা বরং বেশি কার্যকর হবে সে যখন পূর্ণ সজাগ থাকে, তখন। একদিন বুঝালেই ভালো হয়ে যাবে, এমন আশা রাখাও ঠিক নয়। শাসন ও তরবিয়ত মূলত একটি ধারাবাহিক দীর্ঘ কাজ।
আমাদের দায়িত্ব হলো সে কাজটি ধৈর্যের সাথে নিয়মতান্ত্রিকভাবে করে যাওয়া। দোয়া করা। সে কখন ভালো হবে, কখন দায়িত্বশীলতার সাথে নিজে নিজে জাগ্রত হবে, সে বিষয়টি সম্পূর্ণরূপে ন্যস্ত থাকবে একমাত্র আল্লাহ তাআলার উপর।
শেষ কথা
কাউকে সুন্দর করে ঘুম থেকে জাগানো সাধারণ কোনো কাজ নয়। এটি সংবেদনশীল একটি দায়িত্ব এবং একটি শিল্প। এ কাজে যত বেশি ধৈর্যশীল ও কৌশলী হব, কাজটি তত বেশি সহজ হয়ে আসবে। এবং সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি থাকতে হবে, তা হলো মমতা ও কোমলতা।
কারণ, হাদীসে এসেছে: আল্লাহ তাআলা বড় কোমল, তিনি কোমলতাকে ভালোবাসেন এবং কোমলতা অবলম্বন করলে তিনি যে নেয়ামত দান করেন, রুঢ়তা ও কঠোরতা গ্রহণ করলে তা দেন না, এমনকি কোমলতা ছাড়া আর কোনভাবেই তা লাভ করা যায় না (মুসলিম)।
আরেকটি হাদীসে আছে—কোমলতা এমন সুন্দর এক জিনিস, যেখানেই যায়, সুসজ্জিত ও সুশোভিত করে তোলে; এবং কঠোরতা এমন খারাপ বিষয়, যেখানেই যায়, অসুন্দর ও বিভৎস করে তোলে। (মুসলিম)
