আমাদের জীবনে অভ্যস্ততা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। একদিকে এটি কাঙ্ক্ষিত ও সুন্দর; কারণ, অভ্যস্ত না হওয়ার কারণে অনেক ভালো কাজের ক্ষেত্রে আমরা সমস্যায় পড়ি। দেখা যায় কোনোভাবে একবার অভ্যস্ত হয়ে গেলে একই কাজ সহজ ও উপভোগ্য হয়ে ওঠে। আসে স্বাচ্ছন্দ ও ধারাবাহিকতা।
অপরদিকে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে অভ্যস্ততা আমাদের ক্ষতিগ্রস্তও করে। এর অন্যতম বড় একটি ক্ষতি সম্ভবত এই যে, এটি পৃথিবী ও প্রকৃতি, জীবন ও যাপন এবং সমাজ ও সম্পর্ক বিষয়ে আমাদের বিস্ময় ও আনন্দকে নষ্ট করে দেয়। পুরোপুরি নষ্ট করে ফেলে তা নয়; বরং এর প্রাবল্য ও সচেতন উপলব্ধিকে বহুদূর পর্যন্ত কমিয়ে আনে।
যেমন, জীবন সফরে একটু একটু করে যখন পঁচিশ-ত্রিশ বছর কাটিয়ে দিই, তখন প্রতিদিনকার আকাশকে কেবলই একটি নীলচে উপস্থিতি ছাড়া ভিন্ন কিছু মনে হয় না। কে জানে, সাগরপাড়ের মানুষেরা হয়তো সমুদ্রকে বিচার করে কেবলই বৃহৎ একটি জলাধার ও মাছের উৎস হিসেবে।
কিন্তু একটি শিশুর ক্ষেত্রে বিষয়টি এভাবে সত্য নয়। আড়াই, তিন বা চার বছর বয়সে সে যখন চোখ মেলে পৃথিবীকে টের পেতে শুরু করে, সেই উপলব্ধি তাকে বিমোহিত করে। সে আনন্দে, বিস্ময়ে ও মুগ্ধতায় বিপুলভাবে প্লাবিত হয়। এই মুগ্ধতার সূচনা হয় মূলত আরও আগেই।
কল্পনা করুন—আড়াই কি তিন মাস বয়সী একটি শিশু। তৃপ্ত মন নিয়ে মায়ের দিকে অপলক তাকিয়ে আছে। তার চোখে-মুখে ছড়িয়ে আছে উজ্জ্বল হাসির কণা। মা তাকে হেসে হেসে পৃথিবীর সবচেয়ে মধুর কথাগুলো বলছেন আর অসম্ভব একটি আনন্দ ও উচ্ছ্বলতা শিশুটিকে চঞ্চল করে তুলছে। সে নিজেও কথা বলতে চাচ্ছে। লাল টুকটুকে ছোট্ট জিহ্বাটি একটু বাঁকিয়ে একটিমাত্র শব্দ উচ্চারণ করতে পারার যে একান্ত তাড়না—এ দৃশ্যের কোনো তুলনা হয় না।
ধ্বনিকে বিশেষ নিয়মে টুকরো টুকরো করে কীভাবে একটি শব্দ গড়ে তুলতে হয়, সে ব্যাকরণ তার জানা নেই। ফলে বাতাসে কেবল ছড়িয়ে পড়ে অদ্ভুত কিছু শব্দ, ভালোবাসা ও মমতায় মোড়ানো অর্থহীন কিছু ধ্বনি; তবু, শব্দ উচ্চারণের এই টান সে কখনোই উপেক্ষা করতে পারে না। দিন যায় এবং ধীরে ধীরে সে শব্দের আশ্চর্য সুন্দর এক জগতে প্রবেশ করে, যা তার কাছে সম্পূর্ণ নতুন এবং বিস্ময়কর।
অক্ষম শুয়ে থাকা শিশুটি একসময় ওঠে বসে, হামাগুড়ি দেয় এবং একটু একটু করে হাঁটতে শুরু করে। শরীরের প্রতিটি অঙ্গে, রক্ত সঞ্চালনে, অস্থিসন্ধিতে এবং স্নায়ুতন্ত্রে সে একটি নতুন শক্তির উপস্থিতি টের পায়। এতেও সে বিস্মিত হয়। সেই বিস্ময়ের আনন্দ থেকেই হঠাৎ অকারণে দৌড় দেয়, অকারণেই থেমে যায়। আমরা বড়রা একে ‘চঞ্চলতা’ দিয়ে সাধারণ করে ফেলতে চাই। কারণ, অঙ্গসঞ্চালন যে ভয়ানক আশ্চর্য একটি বিষয়, সেই উপলব্ধি হয়তো আমাদের হারিয়ে গেছে; কিন্তু একটি শিশু তা মাত্রই পেতে শুরু করেছে। ফলে এটি তার কাছে সাধারণ চঞ্চলতা নয়; বরং এক বিস্ময় ও আনন্দের উদযাপন মূলত।
এমনিভাবে সে যত বড় হয়, তার পৃথিবীটাও সে অনুপাতে বিস্তৃত হতে থাকে; সেই সাথে বাড়ে হৃদয় ও মস্তিষ্কের ধারণক্ষমতা। বিপুল এই পৃথিবীর সামনে দাঁড়িয়ে তখন তার কৌতূহল ও প্রশ্নের শেষ নেই। ফলে বেশি কথা বলা, বেশি প্রশ্ন করা এবং অধিক চঞ্চল হওয়া শিশুর দোষ নয়; মানুষের দীর্ঘ জীবনযাত্রার এক স্বাভাবিক সূচনামাত্র।
একান্ত মানবিক জায়গা থেকে বিবেচনা করলে এটি সুন্দর একটি গুণও বটে। সে তার আনন্দের এই জগতটিতে কোনো বিঘ্ন সৃষ্টি করতে চায় না। এ কারণেই অনেক সময় বড়দের কথা অমান্য করে সে নিজের আনন্দের কাছে থেকে যেতে চায়।
————————————————————–
অসাধারণ একটি বই: হামাস প্রতিষ্ঠাতা শায়খ আহমদ ইয়াসিনের জবানবন্দি।
লেখক : আহমদ মানসুর। অনুবাদ: হুজাইফা মাহমুদ। প্রকাশক: রাহনুমা প্রকাশনী, ঢাকা
————————————————-
শিশুর এই চাঞ্চল্য নির্দোষ এবং মানবিক হলেও আমাদের জীবনে বিচিত্র ব্যস্ততা আছে, সময়ের অভাব আছে এবং মনোযোগকে বিভিন্ন প্রয়োজনীয় জায়গায় বণ্টন করার আবশ্যকতা আছে। যার কারণে সেখানে একটি নিয়মতান্ত্রিকতা ও শৃঙ্খলার প্রয়োজন হয়।
এদিকে শিশুর চঞ্চলতা অল্প পরিমাণে উপভোগ্য হলেও দীর্ঘ সময় ধরে তা সহ্য করা মুশকিল। যার কারণে আমরা বিরক্ত হই; এমনকি অত্যাধিক চঞ্চল শিশু আমাদের জীবনযাত্রাকে অস্বাভাবিক করে তুলতে পারে। লেখক লিখতে পারেন না, শিক্ষক অধ্যয়ন করতে পারেন না, মায়েরা সাংসারিক কাজে বারবার বাধাগ্রস্ত হন। কোথাও বেড়াতে গেলে শিশুকে সামলে রাখার পেরেশানি বেড়ানোর আনন্দটাই মাটি করে দেয়। এই সমস্যাটির সবচেয়ে বেশি মুখোমুখি হন প্রিয় মাতৃকুল।
ফলে বাধ্য হয়েই শিশুদের শাসন করতে হয়, ধমক দিতে হয়, ভয় দেখাতে হয় কিংবা তিরস্কার করতে হয়। এসব জীবনেরই অংশ মূলত; তবে খুব সূক্ষ্মভাবে এখানে গভীর সংকটের কিছু বিষয়ও আছে:
১. একটু বড় হয়ে উপর্যুপরি শাসনের মুখে পড়ার কারণে সন্তান মানসিকভাবে মা-বাবা থেকে দূরে চলে যেতে পারে। পুরোপুরি দূরে গিয়ে কথাবার্তা বন্ধ করে দেবে—এমনটি সাধারণত হয় না। বাহ্যিকভাবে সব ঠিক থাকলেও মা-বাবার ভিতরে থাকে সন্তানের সাথে সম্পর্কের সূক্ষ্ম ও গভীরতর উপলব্ধি। ফলে তার এই গুটিয়ে যাওয়াটা তারা টের পাওয়া যায়। বিভিন্ন আচরণে সন্তানের নিরানন্দ ও অস্বতঃস্ফূর্ততা প্রকাশ পায়। একজন মা-বাবার জন্য এই উপলব্ধি ভীষণ পীড়াদায়ক, বিশেষ করে মায়েদের জন্য তো রীতিমতো অসহনীয়।
২. শাসনের মাত্রায় ভারসাম্য না থাকলে এবং সাত-আট বছরের একটি শিশু ঘরে আসার পর পর মাত্রাতিরিক্ত শাসনের মুখে পড়লে একসময় ঘর তার কাছে ভীতিকর একটি জায়গায় পরিণত হতে পারে। ফলে ঘর ছেড়ে বাইরে থাকাই তার কাছে সুখকর মনে হবে। এটি নানা দিক দিয়ে তার জন্য ক্ষতিকর।
৩. এখানে ছোটখাটো দাম্পত্য কলহও তৈরি হওয়ার আশংকা থাকে। এই আলোচনার এটিই সবচেয়ে সূক্ষ্ম জায়গা। মায়েরা যেহেতু সবসময় ঘরে থাকেন, তাই সন্তানের ‘উৎপাত’ তাকেই সহ্য করতে হয় সবচেয়ে বেশি। দীর্ঘ বিরক্তির কারণে তার মেজাজ হারানো খুব স্বাভাবিক একটি ব্যাপার। এদিকে বাবা সারাদিন বাইরে থেকে সন্ধ্যায় যখন ঘরে ফেরেন, তখন দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর সন্তানের প্রতি সঞ্চিত মমতা তাকে আকুল করে রাখে। পাশাপাশি সময়ের স্বল্পতার কারণে শিশুর চঞ্চলতা তার কাছে বিরক্তির চেয়ে উপভোগ্যই হয় বেশি। তখন ঘরের ভেতর একটি ভারসাম্যহীন পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। শিশুটি ভাবতে পারে—’মা শুধু রাগ করেন, কিন্তু বাবা অনেক ভালো।’ একই সাথে স্বামীর দিক থেকে স্ত্রী কখনো কখনো অসম অভিযোগের শিকারও হতে পারেন। এটা অনেক সময় যুক্তি-তর্ক বা মান-অভিমান পর্যন্ত গড়ায়।
এখানে স্বামীর জন্য উচিত হবে এই বিষয়টি মাথায় রাখা। তবে, স্ত্রীরও মনে রাখা দরকার—’আমি সারাদিন যন্ত্রণা সহ্য করি, তাই আমার রাগ করাটা স্বাভাবিক’—এই যুক্তির আশ্রয়ে যেন নিজের মাত্রাতিরিক্ত শাসনকে বৈধতা না দিই বা নিশ্চিন্ত না হই। এখানে দরকার হলো উভয় পক্ষই বাস্তবতাকে গভীরভাবে উপলব্ধি করা, শিশুকে শিশুর মতো করে বিবেচনা করা, তাকে শাসন ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখা। সেই সাথে পারস্পরিক দরদ ও সহযোগিতার চর্চা করা, মত বিনিময় ও সান্ত্বনা আদান প্রদান করা। আন্তরিকতার সাথে এই কাজগুলো করতে পারলে সমস্যা অনেক দূর কমে আসবে ইনশাআল্লাহ।
বিশেষ একটি পরামর্শ হলো—আগেই আলোচনা হয়েছে যে, শাসন করতে গিয়ে শিশুকে যেমন আদর করতে হয়, পুরস্কার দিয়ে উজ্জীবিত করতে হয়, তেমনি ক্ষণে ক্ষণে বিভিন্ন বিষয়ে ‘না’ বলতে হয়। এটা করো না, ওখানে যেয়ো না—ইত্যাদি। মুশকিল হলো, শিশুদের চঞ্চলতা ও দুষ্টুমি এত বেশি যে, প্রতিটি বিষয়ে এমন করতে গেলে শাসনের পরিমাণ অনেক বেড়ে যায়। একটা পর্যায়ে শিশুরা এই মানসিক চাপ নিতে পারে না। এতে ভারসাম্য নষ্ট হয়। ফলে, একদিকে যেমন তাকে তার চঞ্চলতার পথে মুক্তভাবে ছেড়ে দেওয়া যাবে না, অপরদিকে এটাও সত্য যে, যেভাবেই হোক না ও নিষেধাজ্ঞার পরিমাণটা যথা সম্ভব কমিয়ে আনতে হবে।
এর জন্য আমরা কয়েকটি বিষয় মনে রাখতে পারি:
ক. শিশুর তারবিয়ত একটি ধারাবাহিক কাজ। সে একদিনে ‘সুবোধ বালকে’ পরিণত হবে না। আমাদের দায়িত্ব হলো এই কাজটা নিরবচ্ছিন্নভাবে চালিয়ে যাওয়া। যা বলব তা সাথে সাথে অক্ষরে অক্ষরে পালন হবে—এমন আশা করা সংগত নয়। কিছু মানবে, কিছু মানবে না—এর ভিতর দিয়েই সে এগিয়ে যাবে এবং ধীরে ধীরে সুন্দর একটি পথে উঠে আসতে থাকবে।
খ. খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে প্রতিটি ছোট-বড় বিষয়ে ‘না’ বা নিষেধাজ্ঞা জারি না করে বাছাই করতে হবে। কিছু বিষয়ে না করব, কিছু বিষয় দেখেও না দেখার ভান করব। খুব ঝুঁকিপূর্ণ না হলে এক-দুই বার বারণ করার পর সে বিরত না হলে পিছে পড়ার প্রয়োজন নেই; বরং কৌশলে তার মনোযোগ অন্যদিকে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা যায়।
গ. শাসনের সময় খেয়াল করতে হবে—আমি কি আসলেই শাসন করছি, নাকি শাসনের নাম দিয়ে নিজের বিরক্তি ও রাগ প্রশমিত করা চেষ্টা করছি? অধিকাংশ ক্ষেত্রে দুটোই একসাথে ঘটে। এখানে শান্ত থাকার চেষ্টা করা উচিত; রাগ করলেও তা যেন সুস্থির মাথায় পরিকল্পিত ও পরিমিত হয়।
ঘ. সব বিষয়ে মুখে নির্দেশনা না দিয়ে চুপচাপ থেকে বা সামান্য কথা বলে নিজ হাতে কাজের আয়োজনটা করে দেওয়া এবং তাকে এর ভেতর ঢুকিয়ে দেওয়া। এটা অনেক বেশি কার্যকর। যেমন—দাঁত ব্রাশ করে ঘুমাতে যাওয়ার বিষয়টি সাধারণত বার বার বলতে হয়। বারবার না বলে তার হাত ধরে ওয়াশরুমে নিয়ে যান, ব্রাশে পেস্ট লাগিয়ে কাছে দাঁড়িয়ে থাকুন। বিভিন্ন ক্ষেত্রে এই পদ্ধতিতে চুপচাপ কাজটা করিয়ে নিলে আশা করা যায় কথার পরিমাণ কমে আসবে এবং দ্রুত সমাধান পাওয়া যাবে। আল্লাহ আমাদের তাওফিক দান করুন।
