নবী ও নবুওয়ত: পরিচয় প্রয়োজনীয়তা ও বৈশিষ্ট্য

নবুওয়তের স্বরূপ

কোন বিষয়ে আমাদের জ্ঞান অর্জন করার মূলত তিনটি মাধ্যম রয়েছে:

১. পাচঁটি ইন্দ্রীয়শক্তি— দৃষ্টিশক্তি, শ্রবণশক্তি, ঘ্রাণশক্তি, স্বাদগ্রহণ, স্পর্শশক্তি
২. মেধা মস্তিষ্ক বা যুক্তি-বুদ্ধি
৩. সত্যবাদি ব্যক্তির সত্য সংবাদ

ধরা যাক, কোনো ব্যক্তির সামনে যদি একটি উঁচু দেয়াল আছে। তিনি দেয়ালের উচ্চতা বা রং সম্পর্কে জানতে পারছেন। কিসের মাধ্যমে? তার দৃষ্টিশক্তির সাহায্যে দেখে এ বিষয়ে জ্ঞান লাভ করছেন।

কিন্তু, দেয়ালটি নিজে নিজে তৈরি হয়ে যায় নি। বরং এটা তৈরির পেছনে একজন মিস্ত্রি কাজ করেছেন। বিভিন্ন উপকরণ দিয়ে এটি তিনি নির্মাণ করেছেন। এই বিষয়টি কিন্তু তিনি চোখ বা অন্যকোন ইন্দ্রীয়শক্তি দিয়ে জানতে পারছেন না। বিষয়টি তিনি মেধা বা যুক্তির সাহায্যে বুঝতে পারছেন।

কিন্তু দেয়ালটির ওপাশে কী আছে? কে আছে? কী ঘটছে? এগুলো পঞ্চইন্দ্রীয় বা যুক্তি-বুদ্ধি, কোনোটির সাহায্যেই জানতে পারছেন না।

হ্যাঁ, কোন সত্যবাদি ব্যক্তি, যিনি দেয়ালের উপরে আছেন কিংবা দেয়ালের অপর প্রান্ত থেকে এসেছেন। ওপারে কী হচ্ছে সেটা দেখছেন, তিনি যদি তাকে জানান—দেয়ালের ওপারে এই এই ঘটছে, তাহলে দেয়ালের নিচে থাকা ব্যক্তিটি তার কথা বিশ্বাস করবে। তার পরিবেশিত সংবাদের ভিত্তিতে এবিষয়ে অর্জিত হবে তার সম্যক জ্ঞান।

পরমকরুণাময় আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। মানুষের প্রয়োজনে তিনি এই বিশ্বে অসংখ্য অগণিত বস্তু সৃষ্টি করেছেন। এগুলো বিভিন্নভাবে মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত রয়েছে। (দ্রষ্টব্য সূরা জাসিয়া, আয়াত ১৩) মানুষ যাতে এসকল বস্তু থেকে উপকৃত হতে পারে, সঠিকভাবে এগুলো ব্যবহার করে দুনিয়ার জীবনকে সহজ ও স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ করতে পারে, এজন্য তিনি দুটি বিশেষ শক্তি দিয়েছেন:

১. পঞ্চঈন্দ্রীয় ২. মানুষের মেধা বা যুক্তি-বুদ্ধি।

এই দুটি শক্তির সাহায্যে কিভাবে প্রাত্যহিক জীবনকে সহজ করবে, সাবলীল ও গতিময় করবে, আল্লাহ তায়ালা জন্মগতভাবে মানুষকে শিখিয়েছেন। ফলে মানুষ এই দুই শক্তিকে কাজে লাগিয়ে ‘অসাধ্য’কে সাধন করছে, আবিষ্কার করেছে বিস্ময়কর হাজারো প্রযুক্তি।

কিন্তু এই দুটি শক্তির সীমাবদ্ধতা আছে। এর দ্বারা মানুষ তার বৈষয়িক অনেক কাজ সমাধান করতে পারলেও জীবনের এমন অনেক মৌলিক বিষয় ও প্রশ্ন আছে, যেগুলোর সমাধান পঞ্চইন্দ্রীয় ও মস্তিষ্ক দিতে পারে না। যেমন: যে মহান সত্ত্বা মানুষকে সৃষ্টি করেছেন, তাঁর পরিচয় কী? তাঁর গুণাবলি কী? তিনি কেন আমাদের এই পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন? আমাদের জীবনের লক্ষ কী? তিনি কোন কাজ পছন্দ করেন? কোন কাজ অপছন্দ করেন? ভালো ও মন্দের সংজ্ঞা কী? মানুষের কর্তব্য ও করণীয় কী? কিভাবে তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে হবে? কিভাবে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জন করা সম্ভব? কিভাবে তাঁর ‘ইবাদত’ করা চাই? মৃত্যু পরবর্তী জীবন কেমন? সেখানে কোন কাজ মানুষকে উপকার করবে? কোন কাজ মানুষের জন্য ক্ষতিকর? পৃথিবীর পরিণতি কী হবে?

কোনো মানুষই মৌলিক এই প্রশ্নগুলো এড়িয়ে যেতে পারে না। চাই সে জাগতিক সর্বোচ্চ সাফল্য, খ্যাতি, ঐশ্বর্য্য যা কিছু লাভ করুক, কোনো না কোনো সময় এসব প্রশ্নের মুখোমোখি সে হবেই।

যেহেতু মানুষের পঞ্চইন্দ্রীয় ও মস্তিষ্ক দ্বারা মৌলিক এই প্রশ্নগুলোর সমাধান লাভ করা সম্ভব নয়, তাই এ বিষয়গুলো মানুষের কাছে তুলে ধরার জন্য মানুষের মধ্য থেকে তিনি কিছু মহান মানুষকে নির্বাচন করেন, যাদেরকে ‘নবী-রাসূল’ বলা হয়। আল্লাহ তায়ালা এই নবী রাসূলদের কাছে তাঁর আদেশ নিষেধ, নির্দেশনা, বিধিবিধান, শিক্ষা, উপদেশ প্রভৃতি বিষয় সরাসরি বা ফেরেশতাদের মাধ্যমে বিশেষ প্রক্রিয়ায় পাঠিয়ে থাকেন। আর আল্লাহ তায়ালা কর্তৃক নবী রাসূলদের প্রতি প্রেরিত বিষয়গুলোকে ‘ওহি’ বলা হয়। প্রত্যেক নবী রাসূল আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে ওহি লাভ করেছেন।

মহান আল্লাহর পরিচয়, তাঁর পছন্দ ও অপছন্দ, ইবাদতের পদ্ধতি, মৃত্যু পরবর্তী জীবন ইত্যাদি বিষয়ও আমাদের পঞ্চইন্দ্রীয় ও মস্তিষ্কের আওতার বাইরের বিষয়। আমরা এগুলো দেখতে পাইনা, শুনতে পাইনা। আবার চিন্তা ও কল্পনা করেও সঠিক সমাধান করতে পারব না। এজন্য আল্লাহ তায়ালা নবী রাসূলদের কাছে ওহি পাঠিয়ে আমাদের জীবনের এই মৌলীক বিষয়গুলো জানিয়ে দেন। এই হিসেবে ওহি মানব জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও অতীব প্রয়োজনীয় একটি বিষয়, সাথে সাথে এটি আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে আমাদের প্রতি বিশেষ অনুগ্রহও। এই অনুগ্রহের কথা আল্লাহ তায়ালা কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে স্পষ্ট করে বারবার বলেছেন। একটি আয়াত পাঠ করুন।

لَقَدْ مَنَّ اللَّهُ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ إِذْ بَعَثَ فِيهِمْ رَسُولًا مِنْ أَنْفُسِهِمْ يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِهِ وَيُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَإِنْ كَانُوا مِنْ قَبْلُ لَفِي ضَلَالٍ مُبِينٍ

নিশ্চয় আল্লাহ মুমিনদের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন, যখন তিনি তাদের কাছে তাদেরই মধ্য হতে একজন রাসূল পাঠিয়েছেন, যিনি তাদের সামনে আল্লাহর আয়াত সমূহ তেলাওয়াত করেন। তাদেরকে পরিশুদ্ধ করেন এবং তাদেরকে শিক্ষা দেন কিতাব ও গভীর প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয়। আর তারা তো পূর্বে স্পষ্ট ভ্রষ্টতার মধ্যে ছিল। সূরা আলে ইমরান, আয়াত ১৬৪।

নবুওয়তের এই স্বরূপ আমাদের কাছে পরিষ্কার থাকলে বুঝতে পারব, মানব কল্যাণে নিয়োজিত যত শ্রেণি-পেশার মানুষ আছে, তাদের মধ্যে নবী-রাসূলদের অবদান ও অনুগ্রহ মানবজাতির উপর সবচেয়ে বেশি। বরং তাঁদের সাথে অন্য কোনো শ্রেণির মানুষের কোনো তুলনাই হতে পারে না। সামনের আলোচনায় বিষয়টি আরো স্পষ্ট হয়ে উঠবে।

নবী-রাসূলদের বৈশিষ্ট্য ও স্বকীয়তা

নবী-রাসূলদের পরিপূর্ণ আনুগত্য ও অনুসরণের জন্য একটি জরুরী বিষয় হচ্ছে তাদের স্বকীয়তা ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে জানা। এতে তাঁদের পরিচয় যেমন স্পষ্ট হবে, তেমনি তাদের গুরুত্ব ও অনিবার্যতা সম্পর্কেও জানা যাবে। তাই সামনের আলোচনায় নবীদের কয়েকটি বৈশিষ্ট্য ও স্বকীয়তা বর্ণনা করব।

১. নবী-রাসূলের শিক্ষার উতস আল্লাহ তায়ালা

মানবসম্প্রদায়কে যে সকল আকীদা-বিশ্বাস, আদর্শ-চেতনা, আমল-আখলাকের দিকে নবীগণ দাওয়াত দিয়েছেন, এসব কিছুর একমাত্র উতস আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে আগত ওহী। অর্থাৎ তাঁদের শিক্ষার উতস ও ভিত্তি হচ্ছেন সরাসরি আল্লাহ তায়ালা। তিনিই তাঁদেরকে নির্বাচন করেছেন তাঁর নির্দেশনা ও শিক্ষা মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে।

নবী রাসূল ছাড়া অন্যান্য মানুষ— দার্শনিক, তাত্ত্বিক, ঐতিহাসিক, গবেষক, বিজ্ঞানি, শাসক বা নেতা, সবাই নির্ভর করে তাদের অভিজ্ঞতা, অনুমান, পর্যবেক্ষণ, চিন্তাভাবনা ইত্যাদির উপর। সন্দেহ নেই, নবী-রাসূলদের চিন্তাশক্তি-পর্যবেক্ষণও সর্বোচ্চ পর্যায়ের। কারণ তারা সকল দিক থেকে সবচেয়ে সেরা মানুষ হয়ে থাকেন। তারপরও তাদের আনীত শিক্ষা ও নির্দেশনা এসবের উপর নির্ভর করে না। তাদের শিক্ষার ভিত্তি শুধুই ওহী বা ঐশী বাণি।

কুরআনে কারীম এ বিষয়টি বারবার বর্ণনা করেছে। কয়েকটি আয়াত পাঠ করুন। ‘আপনি বলুন, আমার নিজের পক্ষ থেকে তা পরিবর্তন করার অধিকার আমার নেই। আমি তো অনুসরণ করি শুধু সেই বিষয়ের যা আমার উপর প্রত্যাদেশ করা হয়’। সূরা ইউনুস, আয়াত ১৫।

وَمَا هُوَ بِقَوْلِ شَاعِرٍ ۚ قَلِيلًا مَا تُؤْمِنُونَ ۝٤١ وَلَا بِقَوْلِ كَاهِنٍ ۚ قَلِيلًا مَا تَذَكَّرُونَ ۝٤٢ تَنْزِيلٌ مِنْ رَبِّ الْعَالَمِينَ ۝٤٣

আর এটি নয় কোনো কবির কথা। তোমরা খুব অল্পই ঈমান আনয়ন করো। এটি কোনো গণকের কথাও নয়। এতো জগতসমূহের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে অবতীর্ণ। সূরা হাক্কাহ, আয়াত ৪১-৪৩

একারণে পবিত্র কুরআনে একটি কথা বার বার বলা হয়েছে, নবীদের আনুগত্য করার অর্থ হল, আল্লাহ তায়ালারই আনুগত্য করা। আল্লাহ তায়ালা বলেন,

مَنْ يُطِعِ الرَّسُولَ فَقَدْ أَطَاعَ اللَّهَ

‘আর যে আনুগত্য করল রাসূলের, সে তো আল্লাহরই আনুগত্য করল। সূরা নিসা, আয়াত ৮০। অন্য আয়াতের ভাষ্য হল,

وَمَنْ يُشَاقِقِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَإِنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ

আর যে অবাধ্যতা করল আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের, তাহলে তো আল্লাহ শাস্তি দানে কঠোর। সূরা আনফাল, আয়াত ১৩। অর্থাৎ নবী-রাসূলকে আনুগত্য করা যেমন আল্লাহরই আনুগত্য করা, ঠিক একইভাবে নবী-রাসূলের অবাধ্যতা মানে আল্লাহরই অবাধ্যতা করা।

২. নবীগণ নিষ্পাপ ও যাবতীয় অন্যায় ও ব্যক্তি স্বার্থ থেকে পবিত্র

নবী-রাসূলদের একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, তারা যাবতীয় বিচ্যূতি, বিভ্রান্তি থেকে সংরক্ষিত। মানবীয় ভুল ত্রুটি ও সব রকম ছোটবড় পাপ-অপরাধ, জাগতিক স্বার্থ, পদ-পদবীর লোভ প্রভৃতি থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। একইভাবে ব্যক্তিগত বা সাম্প্রদায়িক বা দলগত স্বার্থ দ্বারাও তাড়িত হন না। সব রকম অন্যায় পক্ষপাত থেকে আল্লাহ তায়ালা তাঁদের হেফাযত করেছেন। কথা কাজ কর্ম ও সিদ্ধান্তে তাঁরা সর্বোচ্চ ইনসাফ আমনতদারিতা ও কল্যাণকামনার মূর্ত প্রতীক। সূরা শুআরায় এসেছে,

كَذَّبَتْ قَوْمُ نُوحٍ الْمُرْسَلِينَ ۝١٠٥ إِذْ قَالَ لَهُمْ أَخُوهُمْ نُوحٌ أَلَا تَتَّقُونَ ۝١٠٦ إِنِّي لَكُمْ رَسُولٌ أَمِينٌ ۝١٠٧ فَاتَّقُوا اللَّهَ وَأَطِيعُونِ ۝١٠٨ وَمَا أَسْأَلُكُمْ عَلَيْهِ مِنْ أَجْرٍ ۖ إِنْ أَجْرِيَ إِلَّا عَلَىٰ رَبِّ الْعَالَمِينَ ۝١٠٩

নুহের সম্প্রদায় রাসূলদের মিথ্যাপ্রতিপন্ন করেছে। তাদের ভাই নুহ যখন তাদের বলল, তোমরা কি (আল্লাহকে) ভয় করবে না? আমি তো তোমাদের জন্য বিশ্বস্ত রাসূল। তাই আল্লাহকে ভয় করো এবং আমার আনুগত্য করো। আর আমি তোমাদের কাছে কোনো ধরণের প্রতিদান চাই না। আমার প্রতিদান তো একমাত্র আল্লাহ তায়ালার কাছে প্রাপ্য। সূরা শুআরা, আয়াত ১০৫-১০৯।

হযরত হুদ সালেহ লুত ও শুয়াইব আলাইহিমুস সালামও একই পরিচয় ও বক্তব্য তুলে ধরেছেন নিজ নিজ সম্প্রদায়ের কাছে। নবীদের পরিচয়ে ব্যবহৃত ‘আমীন’ তথা আমনতদার বা বিশ্বস্ত শব্দটি অত্যন্ত ব্যাপক অর্থবোধক। সব ধরণের আমানতদারিতাকে অন্তর্ভূক্ত করে।

নবী রাসূলদের বাইরে অন্য কোনো শ্রেণির মানুষের ক্ষেত্রে নিষ্পাপ হওয়া বা ভুল ত্রুটি থেকে সংরক্ষিত হওয়ার খোদায়ী ঘোষণা নেই। আর একারণেই নবী-রাসূলগণ সর্বক্ষেত্রে অনুসরণ ও আনুগত্যের একমাত্র উপযুক্ত ব্যক্তি। আল্লাহ তায়ালা অন্যান্য নবীদের উল্লেখ করে নবীজিকে সম্বোধন করে বলেছেন,

أُولَٰئِكَ الَّذِينَ هَدَى اللَّهُ ۖ فَبِهُدَاهُمُ اقْتَدِهْ

তাঁরা সেসকল ব্যক্তি যাদেরকে আল্লাহ সঠিক পথে পরিচালিত করেছেন, অতএব আপনি তাদের পথনির্দেশনার অনুসরণ করুন। সূরা আনআম, আয়াত ৯০

শুধু তাই নয়, আল্লাহ তায়ালা তাদের জীবনযাপন, স্বভাব-চরিত্র, অভ্যাসের প্রতি নিজের সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। বরং তাদের জীবন ধারার পূর্ণাঙ্গ অনুসরণকে মানবজাতির জন্য আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি ও ভালোবাসা অর্জনের একমাত্র উপায় হিসেবে বর্ণনা করেছেন। আল্লাহ তায়ালার ইরশাদ করেছেন,

قُلْ إِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ ۗ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَحِيمٌ

(হে নবী) আপনি বলুন, তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবেসে থাকো তাহলে আমার অনুসরণ করো। এতে আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করবেন। আর আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু। সূরা আলে ইমরান, আয়াত ৩১। অন্য আয়াতে বলেছেন,

لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ لِمَنْ كَانَ يَرْجُو اللَّهَ وَالْيَوْمَ الْآخِرَ وَذَكَرَ اللَّهَ كَثِيرًا

আল্লাহর রাসূলের মাঝে তোমাদের জন্য উত্তম আদর্শ রয়েছে। যে আল্লাহ ও শেষ দিবসকে ভয় করে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে। সূরা আহযাব, আয়াত ২১

৩. নবীদের জ্ঞান ও শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই

নবীগণ মানবজাতির নিকট যে জ্ঞান ও শিক্ষা পেশ করেন, তার কোন বিকল্প নেই। অন্যকোন মাধ্যমে এই জ্ঞান অর্জন করা সম্ভব নয়। মানুষের ইন্দ্রীয় শক্তি যত প্রখরই হোক, কারো মেধা যত ক্ষিপ্র ও শানিতই হোক না কেন, এগুলোর মাধ্যমে নবীদের আনীত জ্ঞান অর্জন করা সম্ভব নয়। ফলে দার্শনিক, বিজ্ঞানি, ঐতিহাসিক, গবেষক, বিশ্লেষক বা কোনো কবি সাহিত্যিক, কেউই নবীদের বিকল্প হতে পারে না। দর্শন, বিজ্ঞান, তত্ত্বকথা—কোনো কিছুই নবুওয়তের প্রয়োজন পূরণ করতে সক্ষম নয়। আমরা শুরুতে দেখিয়েছি, নবুওয়তের উতস আর এসব জ্ঞানের উতস সম্পূর্ণ ভিন্ন।

কুরআনে কারীমের একাধিক আয়াতে নবীদের এই বৈশিষ্ট্য আলোচিত হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন:

عَالِمُ الْغَيْبِ فَلَا يُظْهِرُ عَلَىٰ غَيْبِهِ أَحَدًا ۝٢٦ إِلَّا مَنِ ارْتَضَىٰ مِنْ رَسُولٍ

(আল্লাহ) অদৃশ্যের বিষয় সম্পর্কে অবগত। তিনি তাঁর অদৃশ্য বিষয়ে কাউকে অবগত করেন না। তবে পছন্দনীয় রাসূলকে অবগত করেন। সূরা জিন, আয়াত ২৫

হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম তাঁর পিতাকে এ বিষয়টি বলেছিলেন এভাবে,

يَا أَبَتِ إِنِّي قَدْ جَاءَنِي مِنَ الْعِلْمِ مَا لَمْ يَأْتِكَ فَاتَّبِعْنِي أَهْدِكَ صِرَاطًا سَوِيًّا

হে আমার প্রিয় বাবা, নিশ্চয় আমার কাছে এমন জ্ঞান এসেছে যা আপনার কাছে আসে নি। তাই আপনি আমার অনুসরণ করুন। আমি আপনাকে সরল পথ দেখাবো। সূরা মারয়াম, আয়াত ৪৩

নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পরিচয় হিসেবে বলা হয়েছে,

وَيُعَلِّمُكُمْ مَا لَمْ تَكُونُوا تَعْلَمُونَ

আর তিনি তোমাদের শেখাবেন এমন বিষয় যা তোমরা জানতে না। সূরা বাকারা, আয়াত ১৫১

সুতরাং মানুষ তার মস্তিষ্ক ও পঞ্চইন্দ্রীয় অর্জিত জ্ঞানের সাহায্যে যত কিছুই আবিষ্কার করুক, যত উন্নতি ও প্রগতিই লাভ করুক, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যত উতকর্ষই সাধন করুক, এর কোন কিছুই নবীদের জ্ঞানের বিকল্প হতে পারে না। কারণ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির পুরোটাই হচ্ছে মানুষের অভিজ্ঞতা, পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষা নিরীক্ষার ফলাফল। যা কেবলই পঞ্চইন্দ্রীয় ও মস্তিষ্কের সাহায্যে অর্জিত। ফলে আধুনিক ও বিজ্ঞানের যুগেও ঠিক আগের মতই মানুষের জন্য তাঁদের শিক্ষা ও বাণির অনুসরণ করা সমানভাবে জরুরী ও অবধারিত।

এতে কোন সন্দেহ নেই, বিজ্ঞান ও তার নানা শাখা-প্রশাখা, যা মানুষের কল্যাণে ব্যবহৃত হচ্ছে, এসব আল্লাহ তায়ালার বিশেষ নেয়ামত। আমরা এর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করব। কিন্তু এই বিজ্ঞানকে কিছুতেই নবীদের শিক্ষার প্রতিপক্ষ বা বিকল্প মনে করার যৌক্তিক কোনো ভিত্তি নেই।

৪. নবীদের পয়গাম অকাট্য ও সুনিশ্চিত, যাবতীয় সন্দেহের উর্ধ্বে

কোন বিষয়ে জ্ঞান অর্জনের যে তিনটি মাধ্যমের কথা বললাম, এর মধ্যে স্তর বিন্যাস আছে। একটি অন্যটির চেয়ে শক্তিশালী। ইন্দ্রিয়শক্তি অনেক সময় ভুলের শিকার হতে পারে। যেমন দূর থেকে মরিচিকাকে চোখ পানি হিসেবে দেখে। আবার পানির মধ্যে থাকা সোজা লাঠিকে চোখ বাঁকা দেখে। ঠিক একইভাবে মানুষের মস্তিষ্ক বা যুক্তি-বুদ্ধিও অনেক সময় ভুল সিদ্ধান্ত দেয়। কিন্তু সত্যবাদি ব্যক্তির সত্য সংবাদ সাধরণত এ ধরণের ভুলত্রুটি ও বিভ্রান্তি থেকে নিরাপদ।

আর নবী-রাসূল হচ্ছেন, মহান আল্লাহ তায়ালার সুনির্বাচিত মহা পুরুষ। যারা সর্বদিকে থেকে সাধারণ সত্যবাদি মানুষের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। তাঁরা মহান আল্লাহ তায়ালার সর্বোচ্চ সত্যসংবাদের নির্বাচিত বাহক ও প্রচারক। তাঁদের উপর অবতির্ণ ওহী ও পয়গাম সবরকম শংসয়-সন্দেহের উর্ধ্বে। পবিত্র কুরআনে বিষয়টির প্রতি মানবগোষ্ঠীকে আল্লাহ তায়ালা বিশেষভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। তিনি ইরশাদ করেন,

ذَٰلِكَ الْكِتَابُ لَا رَيْبَ فِيهِ

এটা সেই কিতাব যাতে কোনো সন্দেহ নেই। সূরা বাকারা, আয়াত ২। অন্যত্র বলেছেন,

تَنْزِيلُ الْكِتَابِ لَا رَيْبَ فِيهِ مِنْ رَبِّ الْعَالَمِينَ

এটি আল্লাহ বিশ্বজগতের প্রভূর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ কিতাব, যাতে কোনো সন্দেহ নেই। সূরা সাজদাহ, আয়াত ২। আরোও বলেছেন,

وَبِالْحَقِّ أَنْزَلْنَاهُ وَبِالْحَقِّ نَزَلَ ۗ وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا مُبَشِّرًا وَنَذِيرًا

আর সত্যসহ আমি তা অবতীর্ণ করেছি। আর সত্যসহই তা অবতীর্ণ হয়েছে। এবং আমি আপনাকে পাঠিয়েছি সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারি হিসেবে। সূরা ইসরা, আয়াত ১০৫।

ইন্দ্রিয়ের কাজ যেখানে গিয়ে শেষ, সেখানে মস্তিষ্কের কাজ শুরু হয়। মস্তিষ্ক যেখানে অকার্যকর হয়ে পড়ে সেখান থেকে সত্য সংবাদের কাজ শুরু হয়। আর নবীদের উপর অবতীর্ণ খোদায়ী পয়গাম হচ্ছে সর্বোচ্চ সত্য সংবাদ। ফলে নবীদের পয়গাম বা ওহী ঈন্দ্রীয়শক্তি ও মানুষের যুক্তি বিবেকের চেয়ে শক্তিশালী ও অগ্রগণ্য হবে। আর একারণেই কোন ক্ষেত্রে মানুষের পঞ্চইন্দ্রীয় ও যুক্তি-বুদ্ধির সাথে যদি ওহির বক্তব্য ও নির্দেশনা বাহ্যিকভাবে সাংঘর্ষিক মনে হয়, তাহলে ওহির বক্তব্যই প্রাধান্য পাবে। ঈন্দ্রীয় বা যুক্তি-বুদ্ধিকে অবলম্বন করে নবীদের আনীত শিক্ষা প্রত্যাখ্যান করার কোনো সুযোগ নেই। প্রকৃতপক্ষে এটা মূর্খতা ও অনধিকার চর্চা। কুরআনে কারীম এ ধরণের চিন্তাকে প্রত্যাখ্যান করেছে কঠোরভাবে। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন,

بَلْ كَذَّبُوا بِمَا لَمْ يُحِيطُوا بِعِلْمِهِ وَلَمَّا يَأْتِهِمْ تَأْوِيلُهُ

বরং তারা যে বিষয়ের জ্ঞান আয়ত্ব করেনি তাকে মিথ্যা সাব্যস্ত করেছে। আর এর পরিণতি এখনো তাদের কছে আসেনি। সূরা ইউনুস, আয়াত ৩৯।

৫. নবী-রাসূলদের উপর অবতীর্ণ ওহী সবধরনের বিকৃতি ও পরিবর্তন থেকে সংরক্ষিত:

আল্লাহ তায়ালা নবী-রাসূলদের প্রতি প্রেরিত ওহিকে সর্বোত্তম পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করেন। ওহি পাঠানোর জন্য একজন ফেরেশতা জিবরাইলকে নিযুক্ত করেছেন। তার সামনে পেছনে অসংখ্য ফেরেশতা নিযুক্ত করে রেখেছেন। ফলে ওহির জ্ঞানে অন্য কেউ (যেমন— শয়তান জিন বা অন্যান্য মানুষ) হস্তক্ষেপ করতে পারে না। কুরআনে কারীমে বলা হয়েছে,

فَإِنَّهُ يَسْلُكُ مِنْ بَيْنِ يَدَيْهِ وَمِنْ خَلْفِهِ رَصَدًا ۝٢٧ لِيَعْلَمَ أَنْ قَدْ أَبْلَغُوا رِسَالَاتِ رَبِّهِمْ وَأَحَاطَ بِمَا لَدَيْهِمْ وَأَحْصَىٰ كُلَّ شَيْءٍ عَدَدًا ۝٢٨

আর আল্লাহ তাঁর আগে পিছে প্রহরী নিয়োজিত করেন। যাতে তিনি জেনে নেন যে, তাঁরা তাঁদের রবের পয়গামসমূহ পৌঁছিয়েছে। আর তিনি লোকদের নিকট যা রয়েছে, তা (নিজ জ্ঞান দ্বারা) পরিবেষ্টন করে আছেন এবং তিনি সব কিছু পরিপূর্ণ হিসাব করে রেখেছেন। সূরা জিন, আয়াত ২৮-২৯।

এভাবে আল্লাহর বার্তা বহন করে সেই ওহিবাহক ফেরেশতা যথাযথভাবে পৌছে দেন নবী-রাসূলদের কাছে। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন,

إِنَّهُ لَقَوْلُ رَسُولٍ كَرِيمٍ ۝١٩ ذِي قُوَّةٍ عِنْدَ ذِي الْعَرْشِ مَكِينٍ ۝٢٠ مُطَاعٍ ثَمَّ أَمِينٍ ۝٢١

নিশ্চয় এটা (অর্থাৎ কুরআন) এক সম্মানিত ফেরেশতার আনীত বাণী। যে শক্তিশালী, আরশের অধিপতির কাছে মর্যাদাসম্পন্ন। যাকে সেখানে মান্য করা হয় এবং যে বিশ্বাসভাজন। সূরা তাকভীর, আয়াত ১৯-২১।

একইভাবে ফেরেশতা যে ওহি পৌঁছে দেন রাসূল সেটা বুঝতে ভুল করেন না। কেননা রাসূলকে পাঠ করানো ও বুঝানোর পূর্ণ দায়িত্ব আল্লাহ তায়ালা নিজে গ্রহণ করে থাকেন। কুরআনের ভাষ্য হল,

لَا تُحَرِّكْ بِهِ لِسَانَكَ لِتَعْجَلَ بِهِ ۝١٦ إِنَّ عَلَيْنَا جَمْعَهُ وَقُرْآنَهُ ۝١٧ فَإِذَا قَرَأْنَاهُ فَاتَّبِعْ قُرْآنَهُ ۝١٨ ثُمَّ إِنَّ عَلَيْنَا بَيَانَهُ ۝١٩

(হে রাসূল!) আপনি এ কুরআনকে তাড়াতাড়ি মুখস্থ করার জন্য এর সাথে আপনার জিহবা নাড়াবেন না। (আপনার বক্ষে) তা সংরক্ষণ করা এবং (আপনার মুখে) তা পাঠ করানোর দায়িত্ব আমারই। সুতরাং আমি যখন এটা (জিবরাঈলের মাধ্যমে) পাঠ করি, তখন আপনি সেই পাঠের অনুসরণ করুন। তারপর তার বিশদ ব্যাখ্যার দায়িত্বও আমারই। সূরা কিয়ামাহ, আয়াত ১৬-১৯।

আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে পয়গাম লাভ করার পর নবী-রাসূল সেই ওহি ভুলে যান না। আল্লাহ তায়ালা বলেন,

سَنُقْرِئُكَ فَلَا تَنْسَىٰ ۝٦ إِلَّا مَا شَاءَ اللَّهُ ۚ

নিশ্চয় আমি আপনাকে পড়িয়ে দেব। অতএব ভুলবেন না। আল্লাহ যা ইচ্ছা করেন তা ছাড়া। সূরা আ’লা, আয়াত ৬-৭। নবী-রাসূল নিজের পক্ষ আল্লাহর পয়গামে কোনো রকম রদবদল বা কাটছাট করেন না। বরং যে পয়গাম এসেছে তা-ই পৌঁছে দেন মানবজাতির কাছে, পূর্ণ আমানতদারিতার সাথে। পবিত্র কুরআনের ভাষ্য হল,

وَمَا عَلَى الرَّسُولِ إِلَّا الْبَلَاغُ الْمُبِينُ

আর রাসূলের দায়িত্ব তো কেবল স্পষ্টভাবে পৌঁছে দেয়া। সূরা নূর, আয়াত ৫৪।

যেখানে সাধারণ সত্যবাদির সংবাদে নানা রকম ভুল-ভ্রান্তি, মিশ্রণ, পরিবর্তন ইত্যাদির আশঙ্কা থাকে, নবী-রাসূলদের কাছে আসা ওহী বা খোদায়ী পয়গাম এসব থেকে পরিপূর্ণ মুক্ত। এটিও নবী-রাসূলদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

৬. সত্য প্রকাশে নবী-রাসূলগণ সমাজ ও পরিবেশ দ্বারা প্রভাবিত হন না

সাধারণত মানুষ তার সমাজ ও প্রতিবেশ দ্বারা প্রভাবিত হয়। এই প্রভাব পড়ে তার চিন্তা বিশ্বাস কর্ম ও বক্তব্যে। ফলে শুধু একারণে তারা অনেক ক্ষেত্রে সত্য থেকে বিচ্যূত হয়ে যায়। জাগতিক স্বার্থের জালে তাদের আদর্শ ও বিবেক আটকে যায় প্রায়ই। তবে নবী রাসূলদের অবস্থান এক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ভিন্ন ও বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। যদিও নিজ গোত্রের বিরোধি মানুষ ও সমাজ-বাস্তবতা তাদের উপর প্রভাব বিস্তার করতে জোর চেষ্টা চালায়। আদর্শ ও মূলনীতি থেকে সরে আসার আহবান জানায় বারবার। কিন্তু তারা পরিবেশ দ্বারা সামান্যও প্রভাবতি হন। না তাদের আদর্শ ও শিক্ষায় কোনো রদবদল করতে সম্মত হন। এতে তাদের সীমাহীন কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে। কিন্তু এমনতর প্রলোভন তারা ফিরিয়ে দিয়েছেন। আপোষ করেন নি এতটুকু। বরং পরিবেশ ও সমাজকেই তারা প্রভাবিত করেন। আল্লাহর পক্ষ থেকে আগত সত্য বাণি ও শিক্ষা প্রচারই ছিল তাদের জীবনের মূল লক্ষ্য।

وَإِذَا تُتْلَىٰ عَلَيْهِمْ آيَاتُنَا بَيِّنَاتٍ قَالَ الَّذِينَ لَا يَرْجُونَ لِقَاءَنَا ائْتِ بِقُرْآنٍ غَيْرِ هَٰذَا أَوْ بَدِّلْهُ ۚ قُلْ مَا يَكُونُ لِي أَنْ أُبَدِّلَهُ مِنْ تِلْقَاءِ نَفْسِي ۖ إِنْ أَتَّبِعُ إِلَّا مَا يُوحَىٰ إِلَيَّ ۖ

আর যখন আমার আয়াত সমূহ পাঠ করা হয় তাদের কাছে, তখন যারা আমার সাক্ষাতের ভয় করে না, তারা বলে, এই কুরআনের পরিবর্তে অন্য কুরআন নিয়ে আসো। অথবা এটাকে পরিবর্ত করো। আপনি বলুন, নিজের পক্ষ থেকে পরিবর্তন করার অধিকার আমার নেই। আমি তো তাই অনুসরণ করি, যা আমার কাছে প্রত্যাদেশ করা হয়। আমি তো ভয় করি ভয়াবহ দিনের শাস্তিকে, যদি আমি আমার রবের অবাধ্যতা করি। সূরা ইউনুস, আয়াত ১৫।

তার মানে এই নয় যে, নবী-রাসূলগণ কৌশল বা সহজতার পথ গ্রহণ করেন নি। অবশ্যই করেছেন। কিন্তু সেটা মূল শিক্ষায় কোনো রকম রদবদল বা হস্তক্ষেপ ছাড়া। এবং এই সহজতাও অবলম্বন করেছেন আল্লাহ প্রদত্ত্ব ওহীর আলোকে। নবীজি বলেছেন, তোমরা সহজতা অবলম্বন করো, কঠোরতা করো না। সুসংবাদ দাও, মানুষকে বীতশ্রদ্ধ করো না। সহীহ বুখারী, হাদীস ৬৯।

৭. শুধু অনুগত্যই নয়, নবীগণ সর্বোচ্চ ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার পাত্রও

যারা নবীদের মর্যাদা ও বৈশিষ্ট্য অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়েছে, তারা নবীদের আনুগত্যকে শুধু আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করতে চেয়েছে। এটি ভয়াবহ একটি ভ্রান্তি। কুরআন হাদীসে নবী-রাসূলদের যে মর্যাদা ও স্বকীয়তা বর্ণনা করা হয়েছে, সেখানে তাদের আনুগত্যকে শুধু আইনিভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি যে, তাঁরা আল্লাহ নির্বাচিত ব্যক্তি। তাদের কাছে ওহী আসে। অতএব তাদের আনুগত্য করতে হবে।

বরং বাস্তবতা হচ্ছে, আনুগত্যের সাথে তাঁদের সাথে মানবজাতির আত্মিক গভীর বন্ধন তৈরি করাকে আবশ্যক আখ্যায়িত করা হয়েছে। তাঁদের প্রতি সীমাহীন ভালোবাসা শ্রদ্ধা ভক্তি ও আদব রক্ষাকে ঈমানের শর্ত হিসেবে আখ্যয়িত করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে কয়েকটি আয়াত ও হাদীস লক্ষ্য করুন। প্রসিদ্ধ একটি হাদীসে নবীজি বলেছেন,

لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى أَكُونَ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِنْ وَالِدِهِ وَوَلَدِهِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ

তোমাদের কেউ মুমিন হবে না, যতক্ষণ না আমি তার কাছে অধিক প্রিয় হই, তার পিতা পুত্র ও সকল মানুষের তুলনায়। সহীহ বুখারী, হাদীস ১৫। সূরা ফাতহে বলা হয়েছে,

إِنَّا أَرْسَلْنَاكَ شَاهِدًا وَمُبَشِّرًا وَنَذِيرًا ۝٨ لِتُؤْمِنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ وَتُعَزِّرُوهُ وَتُوَقِّرُوهُ ۝٩

নিশ্চয় আমি আপনাকে পাঠিয়েছি সাক্ষী সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারি হিসেবে। যাতে তোমরা ঈমান আনয়ন করো আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি। আর যাতে তোমরা তাঁকে সাহায্য করো এবং সম্মান করো। সূরা ফাতহ, আয়াত ৮-৯। অন্য আয়াতের নির্দেশনা হচ্ছে,

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَرْفَعُوا أَصْوَاتَكُمْ فَوْقَ صَوْتِ النَّبِيِّ وَلَا تَجْهَرُوا لَهُ بِالْقَوْلِ كَجَهْرِ بَعْضِكُمْ لِبَعْضٍ أَنْ تَحْبَطَ أَعْمَالُكُمْ وَأَنْتُمْ لَا تَشْعُرُونَ ۝٢

হে মুমিনগণ, তোমরা নিজেদের আওয়াজকে নবীর আওয়াজের উপর করো না। এবং তোমরা একে অন্যের সাথে যেভাবে জোরে কথা বলো নবীর সাথে জোরে কথা বলো না। কেননা এতে আশঙ্কা রয়েছে যে, তোমাদের আমলসমূহ এমনভাবে নিষ্ফল হয়ে যাবে, তোমরা টেরও পাবে না। সূরা হুজুরাত, আয়াত ২।

নবীকে ‘নবী’ মানার অর্থ কী?

কোনো ব্যক্তিকে দার্শনিক চিকিৎসক স্থপতি বা বিজ্ঞানি মানার অর্থ এই নয়- তার সকল মতামত ও সিদ্ধান্ত সর্বান্তকরণে মানতে হবে। বাস্তবতা হল, অনেক ক্ষেত্রে তাদের সাথে দ্বিমত করার সুযোগ থাকে। কিন্তু নবীকে নবী মানার অর্থ হল, তাঁর সকল কথা সিদ্ধান্ত নির্দেশ ও শিক্ষা মেনে নিতে হবে। তিনি যা কিছু জানাচ্ছেন, সবই আল্লাহ তায়ালা থেকে জেনে জানাচ্ছেন। এর সব কিছুই সর্বোচ্চ ও ধ্রুব সত্য। আল্লাহর নবীর পেশ কৃত কোনো বিষয়ে দ্বিমত করা, সন্দেহ বা আপত্তি করার কোনো সুযোগ নেই। নিজের বিবেক বুদ্ধি সেই বিষয়টি বুঝতে পারছে না, শুধু এ কারণে নবীর কোনো কথায় সন্দেহ করা চূড়ান্ত মূর্খতা। কেউ যদি এমন কাজ করে তাহলে নবী-রাসূলের প্রতি ঈমানই থাকবে না। পবিত্র কুরআনের একাধিক আয়াতে বিষয়টি আলোচিত হয়েছে। একটি আয়াত পাঠ করুন,

فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنْفُسِهِمْ حَرَجًا مِمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا

আপনার প্রভূর শপথ, তারা কিছুতেই মুমিন হবে না, যতক্ষণ না তাদের মাঝে বিবাদমান বিষয়ে আপনাকে ফায়সালাকারী হিসেবে মেনে নেয়, তারপর আপনার সিদ্ধান্তের বিষয়ে নিজেদের অন্তরে কোনো অসুবিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণাঙ্গভাবে (আপনার সিদ্ধান্তের প্রতি) সমর্পিত হয়। সূরা নিসা, আয়াত ৬৫।

নবীদের শিক্ষা প্রত্যাখ্যান করার পরিণতি ভয়াবহ

জাগতিক উন্নতি-প্রগতি সবকালেই ছিল। সময় উপযোগি প্রযুক্তি ও জ্ঞান-বিজ্ঞান অতীতেও ছিল। কাফেরদের একটি ভ্রান্তি ছিল, এই প্রাচুর্য, ধন-সম্পদ, প্রযুক্তি, জাগতিক জ্ঞান-বিজ্ঞানকে নবীদের আনীত শিক্ষার বিপরীতে তারা দাঁড় করিয়েছিল। তারা মনে করতো, ধন-সম্পদ ও জ্ঞান বিজ্ঞানে আমরা নবী ও তাঁর অনুসারীদের চেয়ে এগিয়ে আছি। ফলে আমাদের অন্যান্য শিক্ষা ও পয়গামের (যা নবী-রাসূলগণ নিয়ে এসেছেন) প্রয়োজন নেই। বর্তমান বিজ্ঞানের চোখধাঁধানো আবিষ্কার ও প্রযুক্তির দোহাই দিয়েও অনেক মানুষ নবী-রাসূলদের আনীত শিক্ষা থেকে বিমুখ থাকতে চায়। অথচ এটি ভয়াবহ একটি ভ্রষ্টতা। কেননা ইতিপূর্বে আমরা দেখেছি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি যত উন্নতিই করুক না কেন, তা কিছুতেই নবীদের শিক্ষার বিকল্প হতে পারে না। অতীতে যারা এই চিন্তা করেছিল তাদের পরিণতি ছিল ধ্বংস। পবিত্র কুরআনের ভাষ্য হল,

فَلَمَّا جَاءَتْهُمْ رُسُلُهُمْ بِالْبَيِّنَاتِ فَرِحُوا بِمَا عِنْدَهُمْ مِنَ الْعِلْمِ وَحَاقَ بِهِمْ مَا كَانُوا بِهِ يَسْتَهْزِئُونَ

আর যখন তাদের রাসূলগণ তাদের কাছে সুস্পষ্ট প্রমাণাদি নিয়ে এসেছিলেন, তারা তাদের কাছে থাকা জ্ঞান নিয়ে আনন্দিত হয়ে পড়েছিল। আর তাদেরকে বেষ্টন করেছিল সে বিষয় (শাস্তি) যা নিয়ে তারা উপহাস করতো। সূরা গাফির, আয়াত ৮৩।

শেষ নবীকে মানার অর্থ সকল নবীকে মানা

নবুওত সম্পর্কে পবিত্র কুরআন যেসকল শিক্ষা দিয়েছে তার মাঝে একটি হল, আল্লাহ তায়ালার প্রেরিত সকল নবী-রাসূলের প্রতি ঈমান আনতে হবে। একজন নবীর প্রতি ঈমান না আনার কারণে কারো প্রতি ঈমান গ্রহণযোগ্য হবে না। বরং সেটা হবে কুফুরি। ফলে আল্লাহর নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর কেউ যদি ঈমান না আনে, শুধু অন্যান্য নবীদের প্রতি ঈমান আনার দাবী করে, তাহলে সেটাও কুফুরি হবে। পবিত্র কুরআনের ভাষ্য হল,

إِنَّ الَّذِينَ يَكْفُرُونَ بِاللَّهِ وَرُسُلِهِ وَيُرِيدُونَ أَنْ يُفَرِّقُوا بَيْنَ اللَّهِ وَرُسُلِهِ وَيَقُولُونَ نُؤْمِنُ بِبَعْضٍ وَنَكْفُرُ بِبَعْضٍ وَيُرِيدُونَ أَنْ يَتَّخِذُوا بَيْنَ ذَٰلِكَ سَبِيلًا ۝١٥٠ أُولَٰئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ حَقًّا

নিশ্চয় যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলদের অস্বিকার করে, এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলদের মাঝে পার্থক্য সৃষ্টি করতে চায়, আর বলে, আমরা কতকের উপর ঈমান আনব, কতককে অস্বিকার করব, এবং তারা এর মাঝামাঝি একটি পথ গ্রহণ করতে চায়, বস্তুত এরাই প্রকৃত কাফের। সূরা নিসা, ১৫১।

তাছাড়া হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হচ্ছেন আল্লাহ তায়ালার প্রেরিত সর্বশেষ রাসূল। তাঁর মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা নবুওতের ধারাবাহিকতা সমাপ্ত করেছেন। কেয়ামত পর্যন্ত আর কোনো নবীর আগমন ঘটবে না। নবীজির আগমনের পর তাঁর আনীত শিক্ষাই পুরো মানবজাতির মুক্তির একমাত্র মাধ্যম। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন,

قُلْ يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنِّي رَسُولُ اللَّهِ إِلَيْكُمْ جَمِيعًا

আপনি বলুন, হে মানব সম্প্রদায়, আমি তোমাদের সকলের প্রতি আল্লাহর রাসূল হিসেবে প্রেরিত হয়েছি। সূরা আ’রাফ, আয়াত ১৫৮।

বস্তুত, নবীজিকে মানলে অন্যান্য নবী-রাসূলদেরও মানা হবে। কেননা নবীজিকে যে কুরআন দেয়া হয়েছে, তাতে পূর্ববর্তি নবীদের শিক্ষাও আছে। বরং পূর্ববর্তি নবী-রাসূলদের শিক্ষার একমাত্র নির্ভরযোগ্য উৎস হচ্ছে এই পবিত্র কুরআন। ফলে নবীজিকে না মানার অর্থ অন্যান্য নবীদেরও না মানা। আল্লাহ তায়ালা বলেন,

وَأَنْزَلْنَا إِلَيْكَ الْكِتَابَ بِالْحَقِّ مُصَدِّقًا لِمَا بَيْنَ يَدَيْهِ مِنَ الْكِتَابِ وَمُهَيْمِنًا عَلَيْهِ

আর আমি আপনার প্রতি সত্যসহ কিতাব অবতীর্ণ করেছি। যা তার পূর্ববর্তি কিতাবের সত্যায়নকারি এবং তার ধারক। সূরা মায়েদা, আয়াত ৪৮

গ্রন্থপঞ্জি—

شرح العقائد للعلامة التفتازاني
تفسير عثمانى، للعلامة شبير أحمد العثماني
علوم القرآن، للمفتي محمد تقي العثماني
النبوة والأنبياء، للشيخ أبي الحسن علي الندوي
خطبات مدراس، للعلامة سليمان الندوي
دين وشريعت، للشيخ منظور النعماني
قرآن آب سى كيا كهتا هى، له.

Picture of আনাস চৌধুরী
আনাস চৌধুরী
আনাস চৌধুরীর জন্ম নব্বইয়ের শেষ দিকে, হবিগঞ্জ সদরে। পড়াশোনা করেছেন ঢাকার জামিয়াতুল উলুমিল ইসলামিয়াতে। পরবর্তিতে দারুল উলুম দেওবন্দেও অধ্যয়ন করেছেন এক বছর। পেশায় তিনি একজন শিক্ষক, হবিগঞ্জের দারুল ইরশাদ বহুলা মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করছেন। লেখালেখি, অনুবাদ ও দ্বীনি আলোচনাতেও তার অংশগ্রহণ রয়েছে। বাংলা ও আরবীতে অনুবাদ করেছেন বেশ কিছু বই। ইতিমধ্যে কয়েকটি প্রকাশিত হয়েছে।
লেখকের অন্যান্য লেখা

সূচিপত্র

সর্বাধিক পঠিত
উত্তম আখলাক: অনন্য ছয়টি মর্যাদা
ঈমানের পরিচয় ও প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা
ক্রোধ সংবরণ: কেন ও কিভাবে
নববী চিকিৎসা : কিছু প্রয়োজনীয় আলোকপাত
কুরআনের আলো পেতে যে বিষয়গুলো লাগবেই!
হিন্দুত্ববাদী সন্ত্রাসের শিকার ভারতীয় মুসলমান ~ স্বরূপ ও নেপথ্য কারণ