শুরুর কথা
সন্দেহ মানে কোন বিষয়ে অনিশ্চয়তা ও দোদুল্যমানতা। উদাহরণত, এক লোকের কাছে কেউ কিছু টাকা পায়। সেই টাকা তিনি পরিশোধ করেছেন নাকি করেন নি, এব্যাপারে নিশ্চিত হতে পারছেন না। একবার মনে হচ্ছে, তাকে টাকাটা দিয়েছি। আবার মনে হচ্ছে, না, পরিশোধ করা হয়নি। এদিকেও না, ওদিকেও না, এমন ‘অস্থির’ বা ‘দোটানা’ অবস্থাকে সংশয় বা সন্দেহ বলা হয়। বুঝাই যাচ্ছে, সন্দেহ বিষয়টা ভালো কিছু না। এটি একটি অচলাবস্থা এবং ক্ষেত্র বিশেষে গণ্য হয় রোগ হিসেবে। বিশিষ্ট পণ্ডিত জাহেযের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সংশয়-সন্দেহের কারণে যে অস্থিরতা তৈরি হয় তা থেকে ক্লান্তি, দুশ্চিন্তা ও একাকীত্বের মতো সমস্যা সৃষ্টি হয়ে থাকে। (রাসায়েল আদাবিয়াঃ ১ঃ ৪৪৯)
দৈনন্দিন ছোট-বড় বৈষয়িক বিষয়ে যদি সন্দেহ তৈরি হয়, এটি মন্দ প্রভাব তৈরি করে আমাদের জীবনে। আমরা অস্থির হয়ে যাই। আর সত্য হল, দ্বীন-ইসলাম বা কুরআন-হাদীসের শিক্ষা ও নির্দেশনা হচ্ছে, আমাদের ইহকাল ও পরকালীন জীবনের সবচে প্রয়োজনীয় ও আবশ্যকীয় বিষয়। এই পবিত্র আলো ছাড়া মানবজাতি বাস্তবিক অর্থে অন্ধকার সমুদ্রে হাবুডুবু খাবে। কুরআন হাদীসের এমনতর অকাট্য ও ধ্রুব সত্য শিক্ষার কোন অংশে সন্দেহ পোষণ কী বিপদজনক ও ভয়াবহ! সহজেই অনুমান করা যায়। এই কারণে কুরআন হাদীসে দ্বীন-ইসলাম সম্পর্কে সন্দেহ পোষণের ব্যাপারে সুস্পষ্ট বক্তব্য রয়েছে।
প্রথমত, ঈমান ইসলাম শুদ্ধ ও গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য সন্দেহ ও সংশয় না থাকাকে শর্ত করা হয়েছে। পবিত্র কুরআনের বক্তব্য হচ্ছে, ‘মুমিনতো তারাই যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রতি ঈমান এনেছে অতঃপর সন্দিহান হয়নি…(সুরা হুজুরাত, আয়াত-১৫) হাদীসের ভাষ্য হল, ‘আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নেই এবং মুহাম্মদ আল্লাহর রাসুল, এদুই বিষয়ে সন্দেহ না করে যে বান্দা আল্লাহর সাথে সাক্ষাত করবে, সে অবশ্যই জান্নাতে যাবে। (সহি মুসলিম, হাদীস নং-২৭) কুরআন হাদীস দ্বারা প্রমাণিত বিধানে সন্দেহ করতে নিষেধ করে বলা হয়েছে, এই সত্য বিধান আপনার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে আগত। তাই কিছুতেই আপনি সন্দিহান লোকদের অন্তর্ভূক্ত হবেন না। (সুরা বাকারা, আয়াত-১৪৩) সন্দেহের পরিবর্তে যারা অবিচল আস্থা ও বিশ্বাস রাখে পবিত্র কুরআনে তাদের প্রশংসা করা হয়েছে বারবার। ‘আর আমি তাদের মধ্যে কিছু লোককে, যখন তারা সবর করল, এমন নেতা বানিয়ে দিলাম, যারা আমার নির্দেশ অনুসারে মানুষকে পথ প্রদর্শন করত এবং তারা আমার আয়াতসমূহে গভীর বিশ্বাস রাখত। (সুরা সাজদাহ, আয়াত-২৪)
অন্যদিকে সন্দেহ সংশয়ের অবকাশ নেই এমন অকাট্য ও ধ্রুব বিষয়ে যারা সন্দেহ পোষণ করে, তাদের ভর্তসণা করা হয়েছে বহুসংখ্যক আয়াতে। সুরা মুমিনে বলা হয়েছে, ‘বস্তুত এর আগে ইউসুফ তোমাদের কাছে এসেছিলেন উজ্জ্বল নিদর্শনাবলী নিয়ে। তখনও তোমরা তার নিয়ে আসা বিষয়ে সন্দেহে পতিত ছিলে। (সুরা মুমিন, আয়াত-৩৪) আরো বলা হয়েছে, ‘জেনে রেখ, তারা (কাফেররা) তাদের প্রতিপালকের সাক্ষাত সম্পর্কে সন্দেহে পড়ে আছে। জেনে রেখ, তিনি অবশ্যই প্রতিটি বস্তুকে পরিবেষ্টন করে আছেন। (সুরা ফুসসিলাত, আয়াত-৫৪) ঈমান-ইসলাম সম্পর্কে সংশয় পোষণকে মুনাফিকদের স্বভাব হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে সুরা নিসায়। ‘তারা (ঈমান ও কুফরের) মাঝখানে দোদুল্যমান, না এদের দিকে, না তাদের দিকে। বস্তুত আল্লাহ যাকে পথভ্রষ্ট করেন, তার জন্য আপনি কখনই কোনও পথ পাবেন না। (সুরা নিসা, আয়াত-১৪৩)
এ হল ইসলামি শিক্ষা, যেখানে সত্য বিষয়ে সন্দেহকে বিবেচনা করা হয় নিন্দনীয়, বিপদজনক ও প্রত্যাখ্যাত হিসেবে। বিপরীতে পশ্চিমের কিছু চিন্তক ও দার্শনিক সন্দেহকে প্রসংশনীয় ও কল্যানকর আখ্যায়িত করে থাকেন। ক্ষেত্রবিশেষে বিভিন্ন বিষয়ে সন্দেহ পোষণ করতে উতসাহিত করতেও দেখা যায় তাদেরকে। যেমনটি আমরা দেখিয়েছি, সত্য স্পষ্ট হওয়ার পরও যারা সন্দেহ করে, ইসলাম তাদের ভর্তসনা করেছে কঠোর ভাষায়।
আল কুরআনের সতর্কবার্তা
কুরআন ও হাদীসে সন্দেহ সংশয়ের ব্যাপারে আরেকটি বিষয়ে ঈঙ্গিত করা হয়েছে। তা হল, ইসলামের অকাট্য বিধান ও শিক্ষার মোকাবেলা করতে ব্যররথ হয়ে, বিরুদ্ধবাদীরা কূটকৌশল অবলম্বন করবে। কুরআন হাদীসের শিক্ষা ও নির্দেশনা সম্পর্কে মিথ্যা ও প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে নানা রকম সন্দেহ ছড়িয়ে দিবে। ইসলামের প্রতিষ্ঠিত সত্য সম্পর্কে মানুষকে সন্দিহান করে তুলতে গ্রহণ করবে হরেক রকম প্রোগ্রাম। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, মক্কার কাফেররা এই অপততপরতা চালিয়েছিল। মদীনার মুনাফেক ও ইহুদী সম্প্রদায়ও তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করেছে, বরং তাদের ছাড়িয়ে গেছে। পরবর্তিতে ‘যানাদিকা’ ও বাতেনী সম্প্রদায় এ পথে হেঁটেছে। আর বিগত কয়েক শতক যাবত ইসলাম বিষয়ে সংশয় ছড়িয়ে দেয়ার প্রধান দায়িত্ব পালন করছে ইউরোপের ওরিয়েন্টালিস্ট বা প্রাচ্যবিদরা। এই প্রাচ্যবিদদের ‘দূষিত গবেষণা’কে অবলম্বন করে এক শ্রেণির ইসলাম বিদ্বেষী লোকও এক্ষেত্রে বেশ সক্রিয় রয়েছে।
ইসলাম সম্পর্কে সংশয় সন্দেহ ছড়িয়ে দেয়ার বহুমাত্রিক প্রয়াসের বিবরণ পবিত্র কুরআনে এসেছে।সুরা আলে ইমরানে বলা হয়েছে, আহলে কিতাবিদের একটি দল আকাঙ্খা করে, তোমাদের যদি পথভ্রষ্ট করতে পারত! (আলে ইমরান, আয়াত-৬৯) ইমাম রাযি লিখেছেন, এ উদ্দেশ্যে তারা বিভিন্ন সংশয় সন্দেহ মুমিনদের মধ্যে ছড়িয়ে দিত। মুমিনদেরকে ইসলামের ব্যাপারে সন্দিহান করার আরেকটি কৌশল তারা অবলম্বন করত।পবিত্র কুরআনে যা বিবৃত হয়েছে এই শব্দে, আর আহলে কিতাবিদের একটি দল বলে, মুমিনদের উপর অবতীর্ণ বিষয়ে তোমরা ঈমান আনো দিনের শুরু ভাগে এবং দিনের শেষে তা অস্বীকার করো। যেন তারা (মুমিনরা তাদের দ্বীন থেকে) ফিরে আসে। (সুরা আলে ইমরান, আয়াত-৭২)
পবিত্র কুরআনের এসকল বক্তব্যে মুমিনদের প্রতি একটি সাধারণ নির্দেশনা রয়েছে। যতদিন ইসলাম থাকবে ইসলাম সম্পর্কে নানা রকম সন্দেহ সংশয় ছড়িয়ে দেয়ার মানুষও থাকবে। এতে মুমিনদের পেরেশান বা মানসিকভাবে বিচলিত হওয়ার কিছু নেই। অতীতেও এমন হয়েছিল, এখনও হচ্ছে। আমাদের কর্তব্য হচ্ছে, আস্থা ও অবিচলতার সাথে ঈমান ও ইসলামি শিক্ষাকে ধারণ করা।
দ্বীনি বিষয়ে সংশয় সন্দেহ: কেন ও কিভাবে তৈরি হয়
প্রশ্নটি অতি গুরুত্বপূর্ণ। বিষয়টি স্পষ্টভাবে বুঝতে পারলে অগ্রীম প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণ সম্ভব হবে। আবার যাদের মধ্যে ইতিমধ্যে কিছু সংশয় তৈরি হয়ে গেছে তাদের পরিত্রাণও সহজ হবে।
বস্তুত ইসলাম বিষয়ে সন্দেহ তৈরির কারণ বহুমাত্রিক। এখানে মোটাদাগে কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করছি।
- কাফের সম্প্রদায় যেমন ইহুদী খৃস্টান হিন্দু বৌদ্ধ বা নাস্তিক্যবাদি বস্তুবাদি সম্প্রদায়ের চিন্তা দর্শন ও সংস্কৃতির সাথে সম্পর্ক ও সংযোগ দ্বীনি বিষয়ে সন্দেহ তৈরির বড় একটি উতস। সরাসরি তাদের উঠাবসার কারণে যেমন এই সম্পর্ক তৈরি হতে পারে, আবার স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে যে পাঠ্যপুস্তক রয়েছে এবং সেই পরিমণ্ডলে যে ‘জীবনদর্শন বা মূল্যবোধ’ রপ্ত করানো হয়, এর মাধ্যমে এই সংযোগ ঘটে থাকে। এর বাইরে টিভি সিনেমা নাটক দেখে কিংবা পশ্চিমাদের সাহিত্য বিশেষত গল্প উপন্যাস পাঠের মধ্য দিয়েও ইসলাম বিরুদ্ধ দর্শন-জীবনবোধ ও আদর্শের সাথে পরিচয় হতে পারে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ব্যক্তি এই মূল্যবোধগুলো নিজের মধ্যে ধারণ করে অবচেতনভাবে। মুসলিম হওয়ার পরও ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক জীবনদর্শন যখন কেউ গ্রহণ করে নিচ্ছে, তখন তার ভেতর একটি দ্বান্দিক অবস্থার সৃষ্টি হয়। বিশ্বাসের দিক থেকে কিছুটা জোর করে ইসলামি শিক্ষা ও মূল্যবোধকে সঠিক ও পবিত্র মনে করছে, অথবা কমপক্ষে ভুল মনে করছে না, কিন্তু কার্যত সে ইসলাম ও তার মৌলিক দাবীগুলোকে প্রত্যাখ্যান করছে। অস্বস্থিকর এই অবস্থায় কেউ যখন নিজেকে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে, অনিবার্যভাবে এটি তাকে ইসলাম বিষয়ে সন্দীহান করে তুলবে একসময়।
- বইপত্র পাঠ করা নিঃসন্দেহে একটি ভালো ও দরকারি কাজ। কিন্তু এটি যদি অপরিকল্পিত ও বিশৃঙ্খল্ভাবে হয় তাহলে উপকারের চেয়ে অপকারই বেশি হবে। দেখা গেল কোন মুসলিম ইসলামের মৌলিক শিক্ষা, আকীদা কুরআন হাদীস বা তাফসিরের উল্লেখযোগ্য কিছুই পড়েননি, অথচ হেগেল নিতসে বার্টাণ্ড রাসেল বা মার্ক্স-লেনিনকে পড়া শুরু করেছেন। রীতিমতো তাদের থেকে ‘ভালো মন্দ বা করণীয় বর্জনীয়’ সম্পর্কিত পাঠ গ্রহণ করছেন! এভাবে কেউ যখন অনৈসলামিক মূল্যবোধকে মনোযোগের সাথে পাঠ করে এবং এই জগতে বিচরণ করতে থাকে, ইসলামের বিশুদ্ধ শিক্ষা ও অকাট্য বিধান তার কাছে ‘দুর্বোধ্য’ ঠেকতে পারে।
অপরিকল্পিত পাঠের সমস্যাটা ইসলাম বিষয়ক বইপত্র অধ্যয়নের ক্ষেত্রেও হতে পারে। লেখকের নির্ভরযোগ্যতা সম্পর্কে জানা নেই কিংবা পঠিত তথ্য বা বক্তব্যের ভুলশুদ্ধ নির্ণয় করার প্রাথমিক যোগ্যতা নেই এমন ব্যক্তি মনমতো যখন যা ইচ্ছে পড়ে ফেলছেন। অথবা নির্ভরযোগ্য লেখকের বই-ই নিয়েছেন, দেখা গেল তিনি যে স্তরের পাঠক বইটি তার চেয়ে অনেক উঁচু স্তরের। এভাবে জ্ঞান অর্জনের বিন্যাস ও ধারাক্রম রক্ষা না করাও সমস্যা তৈরি করে ক্ষেত্র বিশেষে।
- মুসলিম সমাজে পশ্চিমা সংস্কৃতির প্রভাব ও কর্তৃত্ব দ্বীনি বিষয়ে সন্দেহ তৈরির অন্যতম কারণ। এই কর্তৃত্ব তৈরির পেছনে মোটাদাগে তিনটি বিষয় ক্রিয়াশীল রয়েছে।
- এক- পশ্চিমা উপনিবেশ শক্তিগুলো মুসলিম দেশগুলো দখল করে দুই থেকে দেড় শতক পর্যন্ত সরাসরি শাসন করেছে। ব্রিটিশরা শাসন করেছে ভারতবর্ষ, মিশর, জর্ডান, ইরাক প্রভৃতি অঞ্চল। ফরাসিরা দখল করেছিল আলজেরিয়া, তিউনেসিয়া, মরোক্কো, সিরিয়া অঞ্চল। ইন্দোনেশিয়া ও মালেশিয়াও ছিল ইউরোপীয়দের নিয়ন্ত্রণে। পশ্চিমা উপনিবেশিক দখলদারিত্বের সময়ে মুসলিমদের বড় একটি অংশ তাদেরকে ও তাদের শাসনব্যবস্থা, শিক্ষা ও সংস্কৃতির তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন এবং ইসলামকে বাদ দিয়ে এদের কোন কিছুই তারা গ্রহণ করেন নি। কিন্তু উল্লেখযোগ্য একটি অংশ, বিশেষত আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত মানুষজন পশ্চিমাদের দেখেছে ‘শাসক’ হিসেবে। ফলে ভাষা থেকে শুরু করে চালচলন বেশভূষায় চিন্তা দর্শন সকল ক্ষেত্রে তাদেরকে ‘অনুসরণীয় আদর্শ’ হিসেবে গ্রহণ করেছিল। উপনিবেশিক আমল শেষ হয়েছে ষাট-সত্তর বছর হয়েছে। কিন্তু সমাজের বড় একটি শ্রেণির কাছে তারা এখনো জীবনের সকল ক্ষেত্রে আদর্শ ও অনুসরণীয় হয়ে আছে।
- দুই- বাস্তবতা হল গত দুইতিন শতাব্দিতে জাগতিক জ্ঞানবিজ্ঞানে পশ্চিমারা একচেটিয়া নেতৃত্ব দিয়ে আসছে। এক্ষেত্রে তারা যে অগ্রগতি ও সফলতা অর্জন করেছে এটি বিস্ময়কর। আর জাগতিক এই সফলতার কারণে মুসলিম সমাজের একটি অংশ পশ্চিমাদের প্রতি ‘অন্ধ মুগ্ধ’ হয়েগেছে। ফলে পশ্চিম থেকে যাকিছুই আসছে তাকে তারা গ্রহণ করছে ‘ধ্রুবসত্য’ ও সর্বোন্নত হিসেবে। চাই সেটা বিশ্বাস, মূল্যবোধ, আদর্শ বা জীবনবোধ সম্পর্কিত হোক কিংবা ব্যবহারিক জ্ঞানবিজ্ঞান হোক। অথচ এটি একেবারেই অবাস্তব ও অযৌক্তিক কর্মপন্থা। কেননা চেষ্টা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে কোন ক্ষেত্রে সাফল্য লাভ অন্যসকল ক্ষেত্রে তার যথার্থতা প্রমাণ করে না। বিশেষত পশ্চিমাদের মূল্যবোধ আদর্শ ও শিক্ষা পুরোটাই নির্মিত হয়েছে বস্তুবাদি দর্শনের উপর। এবং এসব কিছুই মানব মস্তিষ্কপ্রসূত। বিপরীতে ইসলাম ও তার যাবতীয় শিক্ষার ভিত্তি হচ্ছে মহান আল্লাহ কর্তৃক অবতীর্ণ ওহি। যা শতভাগ নির্ভুল ও সর্বত্র সর্বকালের জন্য প্রযোজ্য।
- তিন- পশ্চিমা শিক্ষা ও সংস্কৃতির কর্তৃত্ব তৈরি হওয়ার আরেকটি কারণ হচ্ছে তাদের শক্তিশালী মিডিয়া। ইলেক্ট্রনিক, প্রিন্ট ও ডিজিটাল মিডিয়ার শক্তি দিয়ে তারা সত্যকে মিথ্যা, মিথ্যাকে সত্য হিসেবে উপস্থাপন করছে হরদম। সংবাদ, সংস্কৃতি, দর্শন, মূল্যবোধ বা শিক্ষা- কোন বিষয়ই মিডিয়ার এই বিশ্রি আক্রমণ থেকে নিরাপদ থাকেনি। আর মুসলিমবিশ্বের মিডিয়াগুলোও তাদের অনুসরণ করে চলছে অক্ষরে অক্ষরে। এভাবে মিডিয়ার হাত ধরে পশ্চিম ও তার সংস্কৃতির প্রতি ‘সমর্পিত’ হওয়ার মানসিকতা তৈরি হয়েছে সমাজের বিপুল সংখ্যক মানুষের মধ্যে।
এভাবে যখন কারো মধ্যে ইসলাম বিরুদ্ধ দর্শন ও জীবন ধারার প্রতি ‘অন্ধ মুগ্ধতা ‘ তৈরি হয়ে যায় তখন তার পক্ষে ‘সত্য’কে দেখা ও গ্রহণ করা সম্ভব হয় না।
- আমরা ইতিপূর্বে বলেছি, ইসলাম বিষয়ে ভুল তথ্য ও সংশয় ছড়ানোর প্রচেষ্টা চলমান থাকবে। মুরতাদ-ধর্মত্যাগী, নাস্তিক ও কাফেরদের বড় একটি অংশ এই কাজে লিপ্ত রয়েছে। বরং একে গ্রহণ করেছে নিজেদের মূল পেশা ও অবলম্বন হিসেবে। ফলে ইসলাম বিরোধী ও বিদ্বেষপূর্ণ প্রচুর বইপত্র লিখছে, প্রবন্ধ নিবন্ধ বা ব্লগ প্রকাশ করছে বিপুলসংখ্যায়, অনলাইনে অফলাইনে প্রায়ই আলোচনা বা বিতর্ক আয়োজন করছে। সাধারণ মুসলিমদের একটি অংশ এক্ষেত্রে বড় একটি ভুল করে ফেলেন। তারা ইসলাম বিদ্বেষী এসব লোকদের বই-প্রবন্ধ পাঠ করেন, আলোচনা বা বিতর্ক শুনে থাকেন শুধুমাত্র কৌতুহল বশত, যদিও তারা এসবলোকদের ঘৃণা করেন। তারা কী বলে শুধু সেটা জানার জন্য। কিন্তু বারবার এসব বিদ্বেষপূর্ণ ভুলতথ্য ও মিথ্যাচার শুনতে শুনতে একসময় কিছু কিছু সন্দেহ মনে জায়গা করে নেয়। ভুল ও মিথ্যার চরিত্রটাই এমন। অথচ এভাবে কাফিরদের ইসলাম বিরোধি কথা শুনতে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে সুরা আনআ’ম (আয়াত-৬৮) ও সুরা নিসায় (আয়াত-১৪০)। এসব আলোচনা শুনার কোন বৈধতা নেই। এজন্য তাদের লেখা বইপত্র, তাদের ইউটিউব চ্যানেল, ফেসবুক পেইজ, ব্লগ সবকিছু বর্জন করতে হবে। যদি ইসলাম সম্পর্কে জ্ঞান অর্জনের উদ্দেশ্য হয় বা মনে কোন প্রশ্ন থাকে, তাহলে কুরআনি নির্দেশনা হচ্ছে এ বিষয়ে জ্ঞান রাখেন এমন কোন আলিমকে জিজ্ঞেস করা। সঠিক বিষয় জানার জন্য তার সাথে আলোচনা করা। হ্যাঁ, নাস্তিকদের কোন আপত্তি যদি কখনো ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে শুধুমাত্র বিশেষজ্ঞ আলিমগণ তাদের বক্তব্য খণ্ডন করার স্বার্থে এসব পড়তে ও শুনতে পারেন। এই নির্দেশনা পালন করলে ইসলামি বিদ্বেষী লেখক ও আলোচকদের পরিধি খুবই সংকীর্ণ হয়ে আসবে।
- অবিরাম পাপ ও অপরাধ করতে থাকার সাথেও সংশয়-সন্দেহ তৈরির সংযোগ রয়েছে। কুরআন মাজীদে বলা হয়েছে, বরং তাদের কৃতকর্মই তাদের অন্তরে মরিচা ধরিয়ে দিয়েছে। (মুত্বাফফিফীন, আয়াত-১৪) এই মরিচার কারণে সত্যকে সত্য হিসেবে গ্রহণ করতে পারে না। হাদীসেও বিষয়টি বর্ণিত হয়েছে। নবীজি বলেন, বান্দা যখন কোন গোনাহ করে তার অন্তরে একটি কালো দাগ পড়ে। যদি তওবা করে ফেলে তাহলে দাগটি মুছে পরিষ্কার হয়ে যায়। কিন্তু যদি আরো আরো গোনাহ করে তাহলে সেই দাগটি বাড়তে থাকে এক সময় অন্তরকে ছেয়ে ফেলে। (সুনানে তিরমিযি, হাদীস নং-৩৩৩৪) এমন নিকষ কালো অন্তর সম্পর্কে অন্য একটি হাদীসে বলা হয়েছে, তখন এটি সত্যকে সত্য ও মন্দকে মন্দ হিসেবে গ্রহণ করতে পারে না। (সহি মুসলিম, হাদীস নং-১৪৪ )
পাশাপাশি কেউ যখন ইবাদত বন্দেগী, নামাজ, যিকর, তিলাওয়াত প্রভৃতিতে উদাসীন থাকে, বিশেষত দোয়া, আত্মিক ইবাদত- মহান আল্লাহ’র মোরাক্বাবা, মহব্বত ও প্রেম থেকে অন্তর খালি থাকে, তখন এমন শূন্য মানুষকে সংশয়-সন্দেহ সহজে কাবু করে ফেলে। উতকৃষ্ট বিষয় দ্বারা কেউ যদি নিজেকে পূর্ণ করে রাখে, মন্দ বিষয় তাকে সহজে আক্রান্ত করতে পারেনা।
- একইভাবে প্রয়োজন পরিমাণ দ্বীনি জ্ঞান না থাকাও সংশয় সৃষ্টির কারণ হতে পারে। যার নিকট তাওহীদ, ঈমান, ওহি, নবুওয়ত-রেসালাত, আকীদার মৌলিক জ্ঞান, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের পরিচয় ও বৈশিষ্ট্য, একইভাবে কুফর, শিরক, বিদআতসহ কুরআন হাদীসের প্রাথমিক বিষয়গুলো সুস্পষ্ট তিনি সহজে সন্দেহের শিকার হবেন না। শরয়ী বিভিন্ন মূলনীতি ও সামগ্রিক জ্ঞানের আলোকে অনেক স্পষ্টতা দূর হয়ে যাবে এমনিতেই। এবং তার এই উপলব্ধি থাকবে, কোন বিষয়ে সন্দেহ তৈরি হলে একে মনে জিইয়ে না রেখে দ্রুত শরিয়ত বিশেষজ্ঞ পণ্ডিত আলেমের কাছে শরণাপন্ন হতে হবে।
সংক্ষেপে কয়েকটি কারণ সম্পর্কে আলোচনা করা হল। আল্লাহ তায়ালা সবাইকে দ্বীনি বিষয়ে সন্দেহ-সংশয় ও তার সমূহ কারণ থেকে রক্ষা করুন। আমীন।
(সৌজন্যে, মাসিক নেয়ামত, সেপ্টেম্বর ২০২৫)
