গাযার জন্য নীরবতা


বিগত দুই বছরে গাযায় ইসরাইল ও তার পশ্চিমা মিত্ররা মিলে যে নৃশংস বর্বরতা চালিয়েছে নিকট ইতিহাসে এর দ্বিতীয় কোন উদাহরণ আমাদের সামনে নাই। দূরের ইতিহাসেও পাওয়া সম্ভব কি না জানি না। পৃথিবীতে যুদ্ধ,হত্যা, গণ হত্যা, অবরোধ ও স্টার্ভেশনের ইতিহাস অনেক পুরাতন। কিন্তু গাযায় যা ঘটছে তা ইতিহাস দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব না। এই শতকের শুরুতে আমেরিকা ও তার মিত্ররা আফগানিস্তান ও ইরাকে পুরোমাত্রায় গণহত্যা  চালিয়েছে। কয়েক লক্ষ নিরপরাধ মানুষ,নারী ও শিশু মারা গিয়েছে। স্কুল,হসপিটাল, মসজিদ, মাদ্রাসা ,আবাসস্থল সবকিছু নির্বিচারে বোমার আঘাতে উড়িয়ে দিয়েছে। ফাল্লুজা ও মাউসিলের মতো শহর অবরোধ করে মানুষ কে খাদ্য পানীয় ও চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত রেখেছে। গোটা দেশের উপর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করে ভয়ংকর সব বিপর্যয় টেনে এনেছে তাদের উপর। কিন্তু এতকিছুর পরেও সেগুলো গাযায় চলমান নির্মমতার পর্যায়ে পৌঁছায়নি ।  আফগানিস্তান ও ইরাক, বিশাল ভূখন্ড। অনেক মানুষ চাইলেই নিরাপদ আশ্রয়ে বিভিন্ন জায়গায় সরে যেতে সক্ষম হয়েছে । পাশের দেশগুলোতেও আশ্রয় নিয়েছে লাখো মানুষ। আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থাগুলো অনেকটা নির্বিঘ্নেই কাজ করতে পেরেছে। প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে নারী ও শিশুদেরকে টার্গেট করা হয়নি। ত্রাণের জন্য দাঁড়িয়ে থাকা মানুষদের উপর গণহত্যা চালানো হয়নি। মুখ রক্ষার জন্য হলেও তারা সভ্যতার সর্বনিম্ন কিছু নিয়ম কানুন মেনে চলেছে।  


এতকিছু বলার উদ্দেশ্য আমেরিকা ও তার মিত্রদেরকে সাধু বানানো না, এবং না আফগানিস্তান ও ইরাকের মানুষদের দুঃখ দূর্দশা কে ছোট করে দেখা। আমি মূলত বুঝাতে চাচ্ছি বিগত দুই বছর যাবত গাযায় চলমান এই গণহত্যা আমাদের ইতিহাস জ্ঞান কিংবা চাক্ষুষ অভিজ্ঞতা দিয়ে অনুধাবন করা আদৌ সম্ভব না। ইসরাঈল সেই লেভেল পার করে গিয়েছে বহু বহু আগেই। মানব সভ্যতার কবর দিয়ে সেই কবরকেও নিশ্চিহ্ন করে ফেলেছে তারা। আপনি তাদের এই হিংস্রতা কে পশুদের সাথে তুলনা করবেন যে, তাও সম্ভব না। কারন বনের হিংস্র পশুদেরও কিছু নিয়ম কানুন আছে,তারা সেগুলো সম্মানের সাথে মেনে চলে। বর্বরতার দিক দিয়ে বনি ইসরাইলের এই নিকৃষ্ট কীটদের কোন তুলনা আমাদের সামনে নাই।  তারা এমন এক পর্যায়ে পৌছেছে যে নির্মমতার এই ভয়াবহ চিত্র দেখে তাদের অনেক ঘনিষ্ঠ মিত্ররাও হতভম্ব হয়ে পড়ছে। সেখানে প্রায় প্রতিদিনই বর্বরতার নতুন মাইল ফলক স্থাপন করে চলেছে তারা।  যেই হিরোশিমা ও নাগাসাকির উপর ফেলা পারমানবিক বোমার জন্য মানুষ আজও মাতম করে, এর চেয়ে সাত গুন বেশি বোমা ইতিমধ্যেই ফেলা হয়েছে গাযায়। এতে কারও কিছু যায় আসে না। পৃথিবী অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে এই নির্মমতায়। বরং এসব সংবাদ সামনে না পড়লেই যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচে সবাই। 


মাত্র ৩৬৫ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের ছোট্ট একটা ভূখন্ড। এক পাশে সাগর আর তিন পাশে পৃথিবীর সবচাইতে বর্বর শত্রু দ্বারা বেষ্টিত।  আয়তনের হিসাব করলে ঢাকা শহরের চাইতে সামান্য কিছুটা বড় হবে। অনেকে একে পৃথিবীর সবচাইতে বড় উন্মোক্ত কারাগার হিসেবে অভিহিত করেন। কিন্তু আমরা দেখব এই ভূখন্ড মোটেও কারাগারের সাথে তুলনীয় না। কারাগারে মানুষের খাদ্য পানীয় এবং জীবনের নিরাপত্তা থাকে। মৌলিক অধিকার রক্ষা করা হয়। কিন্তু গাযায় এর কোনটাই নাই। একবার ভেবে দেখুন, বিশ লক্ষ মানুষের আবাসস্থল একটা শহরের ৯৫% দালান,ভবন স্থাপনা ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে। এমন কোন স্থাপনা বাকি নাই যেখানে বোমার আঘাত লাগেনি। আপনি যদি রাফাহ, শুজাইয়্যাহ বা খান ইউনিসের দিকে তাকান তাহলে সম্ভবত একটা স্থাপনাও অক্ষত পাবেন না। সব মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়েছে। বাদ যায়নি স্কুল,মসজিদ,হসপিটাল,আশ্রয়কেন্দ্র কিছুই। লক্ষ লক্ষ মানুষ এই সীমাহীন ধ্বংসস্তুপের ভেতর দিয়েই এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় জীবন বাঁচাতে মরিয়া হয়ে ছুটে চলছে। 


মাসের পর মাস অতিবাহিত হয়, খাদ্য ও ত্রাণবাহি একটা ট্রাকও ভেতরে প্রবেশ করে না। কেন? কারন,ইসরাইল মনে করে গাযার নারী,শিশু বৃদ্ধ বনিতা সবাই সমান অপরাধী। তাদের সবাইকেই শাস্তি পেতে হবে। সুতরাং সে খাবার ও পানি আটকে রেখে শাস্তি দিবে। হাসপাতাল জ্বালিয়ে দিয়ে চিকিৎসা বঞ্চিত করে শাস্তি দিবে। মুখের এক টুকরা রুটিও যেখানে কেড়ে নেয় সেখানে বিদ্যুত,জ্বালানি কিংবা চিকিৎসা চাওয়া রীতিমতো বিলাসিতা। 


একবার কল্পনা করে দেখুন, বিশ লক্ষ মানুষ,সবাই ক্ষুদার্ত। দিনের পর দিন না খেয়ে কেটে যাচ্ছে। শিশুরা,মায়েরা,বৃদ্ধ ও অসুস্থ মানুষেরা, ক্ষুধার যন্ত্রণায় কাতর,ছটফট করছে,বিলাপ করছে,অসহায় বাবারা, সন্তানেরা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে। পৃথিবীতে এর চেয়ে ভয়াবহ শাস্তি আর কী হতে পারে! নিজেকে একবার সেই জায়গায় কল্পনা করে দেখুন! 


শুধু কি ক্ষুধা আর তৃষ্ণা? সাথে আছে মৃত্যুর আতংক। মুহুর্মুহু বোমার আঘাত। কখন কোথায় বোম পড়ছে তার কোন ঠিক ঠিকানা নাই। কারন ইস্রাইলিরা শত্রু টার্গেট করে বোমা ফেলে না, তারা টার্গেট করে আজ আমাকে এই পরিমাণ বোমা ফেলতে হবে, যেভাবেই হোক যেখানেই হোক। আরও আছে হিংস্র স্নাইপারের হেডশট। বোরিং ফিল করতে থাকা সৈনিকদের খেলাচ্ছলে  মানুষ খুনের নেশা। ভারি ট্যাংকের ফায়ারিং।  কেউ জানেনা কখন কোনদিক থেকে মৃত্যু এসে ঝাঁপিয়ে পড়বে তার উপর! ঘরে বাইরে মৃত্যু। এক টুকরো রুটি কিংবা এক গ্লাস পানির চাইতেও সহজলভ্য মৃত্যু।  চোখের সামনে নিজের প্রিয়জনদের ক্ষত বিক্ষত লাশ,মৃত্যুর মিছিল, রক্তের স্রোত। চারদিকে শুধু ধ্বংস আর তান্ডবের চিহ্ন।  একবার ভেবে দেখেছেন, এই যে প্রতিদিন শত শত মানুষ নির্মমভাবে আহত হচ্ছে বোমার আঘাতে,তারা যাচ্ছে কোথায়? গাযায় এই মুহুর্তে ফুল ফাংশনাল কোন হসপিটাল নাই। সবগুলোই ধ্বংস করে দিয়েছে। চিকিতসক ও উদ্ধারকর্মীদের টার্গেট করে করে হত্যা করা হয়েছে! আমরা আমাদের মানব মস্তিষ্ক দিয়ে যতটা খারাপ পরিস্থিতির কল্পনা করতে পারি গাযার পরিস্থিতি তার চেয়েও বহুগুনে খারাপ ও শোচনীয়। 


গাযা কি পৃথিবীর দূর প্রান্তের মানব বিচ্ছিন্ন কোন দ্বীপ বা ভূখন্ড? তার আশপাশে আপনজন বলে কেউ নাই? 
না, গাযা আমাদের খুব কাছেই। আমাদের চোখের সামনে। গাযার চারদিক ঘিরে আছে তার মুসলিম ভায়েরা। গাযার দেড় দুই শত কিলোমিটার দূরত্বের মাঝেই অন্তত চারটি শক্তিশালি মুসলিম দেশ রয়েছে। যারা সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তির দিক দিয়ে ইতিহাসের যেকোন সময়ের চেয়ে এখন ভালো অবস্থানে আছে। তথাপি গাযা, তাদের চোখের সামনে, কখনও পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ্য সম্মতিতে, নিদারুণ অবহেলায়, এক অবরুদ্ধ উপত্যকায়,‌ বিশ লক্ষ অসহায় মানুষ, দিনের পর দিন পৃথিবীর সবচাইতে হিংস্র একদল পশুর আক্রোশের শিকার হয়ে তিলে তিলে ধুকে ধুকে মরছে, বোমার আঘাতে,চিকিৎসার অভাবে, ক্ষুধা ও পিপাসায় কাতর হয়ে! 
ইতিহাসে আছে, তাতারিরা যখন বাগদাদে আক্রমণ করলো তখন ভোগ বিলাসে মত্ত থাকা বাগদাদবাসী প্রতিরোধ করা তো দূরের কথা পালানোর বুদ্ধিও ছিল না তাদের মাথায়। এক তাতারি মহিলা দেখল শহরের এক মাথায় কিছু লোক জটলা বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে। মৃত্যুর য়ে থরথর করে কাঁপছে তারা।  সেই মহিলা হুংকার দিয়ে বললো, এই তোরা এখানে দাঁড়া আমি আমার তরবারিটা নিয়ে আসছি ! 
লোকগুলো তার কথামত কোথাও না গিয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে রইল। মহিলা তার তরবারি এনে একে একে সবাইকে হত্যা করলো। কেউ পালিয়েও গেলো না, প্রতিরোধ করার চেষ্টাও করলো না।  
হাজার বছর পর আজ যখন আমরা সেসব ইতিহাস পড়ি তখন বিস্মিত হই। ভাবি, কি এমন হয়েছিল মুসলিমদের যে তারা সবাই একসাথে এমন শোচনীয়ভাবে কলাপ্স করলো মাত্র একটা বাহিনীর সামনে! সভ্যতার চূড়ায় আরোহন করা জ্ঞানে গুণে সমৃদ্ধ একেকটা শহর চোখের পলকে উজাড় হয়ে গেলো! কেউ রুখে দাঁড়াতে পারেনি,সামান্য প্রতিরোধও করতে পারেনি!  
একইভাবে, আজ থেকে কয়েক শত বছর পর মানুষ যখন গাযার ইতিহাস পড়বে, ফিলিস্তিনের ইতিহাস পড়বে, তখন দেখবে রাফাহ শহরকে যখন মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়া হচ্ছিল তখন রাফাহ থেকে মাত্র শ দেড়েক কিলোমিটার দূরে কায়রো ও আম্মানে সবকিছু স্বাভাবিক গতিতে চলছিল। জীবনের কোথাও কোন ছন্দপতন ঘটেনি। প্রানোচ্ছ্বাসে ভরপুর তাদের জীবন।  যখন খান ইউনিস ও দেইর আল বালাহে পৃথিবীর নৃশংসতম গণহত্যা চলছিল তখন  রিয়াদে দেশ বিদেশের নর্তকিরা উড়ে এসে উদ্দাম নৃত্যে মেতেছিল। চারপাশের মানুষ ভোগ বিলাসিতা আর আয়েশে মত্ত ছিল। যখন নিরপরাধ মানুষের আর্তনাদে আকাশ বাতাস ভারী হয়ে ছিল,তখন আমাদের শাসকেরা মগ্ন ছিল আত্মপূজায়। আমাদের উলামারা মগ্ন ছিলেন আত্ম কলহে। আমাদের কাছে অর্থ ছিল, অস্ত্র ছিল,সামর্থ্য ছিল, কিন্তু আমরা এগিয়ে যাইনি। 
মানুষ জানবে, সংখ্যা ও শক্তির বিচারে আমরা কোন অংশেই পিছিয়ে ছিলাম না। তথাপি যেই আমেরিকা এই গণহত্যার মাস্টারমাইন্ড,অর্থ ও শক্তির যোগানদাতা, তাকে সসম্মানে ডেকে এনে আমরা ৫ ট্রিলিয়ন ডলার আর্থিক বিনিয়োগ দিয়েছি। তার রক্ত পিপাসু হাতকে আরও শক্তিশালি করেছি। মানুষ কোনভাবেই এসবের যৌক্তিক কোন ব্যাখ্যা খুঁজে পাবে না। অবাক হয়ে ভাববে, ঠিক কী এমন রোগে আক্রান্ত হয়েছিল উম্মতে মুহাম্মদি! দুই বিলিয়ন মানুষ মিলে অস্ত্র ও শক্তি দিয়ে সাহায্য করাতো দূরের কথা,এক বস্তা আটা দিয়েও সাহায্য করতে পারেনি তাদের অভুক্ত ক্ষুধার্ত ভাই বোনদের ! এই পর্যায়ের  মানুষ আমাদের কে ধিক্কার জানাবে,অভিশাপ দিবে। মানুষ জানবে, আমাদের শাসকেরা চাইলেই কার্যকরি পদক্ষেপ নিয়ে এই বর্বরতা রুখে দিতে পারত। কিন্তু তারা সেটা করে নি। তারা নিশ্চিন্তে মানব ইতিহাসের সবচাইতে নির্মম একটি গণহত্যা সংগঠিত হওয়ার সম্মতি দিয়েছে।
মক্কার মুশরিকরা যখন মুসলিমদের উপর অবরোধ আরোপ করল, তাদের কে সমাজ বিচ্ছিন্ন করে একটি গিরিখাতে বন্দি করে ফেলেছিল, তখন ক্ষুধার্ত শিশুদের কান্নার আওয়াজ দূর দূরান্ত পর্যন্ত শুনা যেত। এক পর্যায়ে এই হৃদয় বিদারক নিষ্ঠুরতা সইতে না পেরে এক মুশরিক যুহাইর ইবনে উমাইয়াহ মক্কার নেতাদের উদ্দেশ্য করে বলেছে- আমরা উদরপূর্তি করে খাবার খাবো,বাহারি পোষাক পরব, আর বনু হাশেমের লোকেরা ক্ষুধা তৃষ্ণায় মারা যাবে! এটা হতে পারে না! এই অবরোধ এখনই বাতিল করতে হবে। 
তার এই কথার পরপরই মুশরিক নেতারা অবরোধ তুলে নিতে বাধ্য হয়। 
আজও “গাযযাতো হাশেমের” লোকেরা ক্ষুধা তৃষ্ণায় কাতর। কিন্তু মুশরিক যুহাইর ইবনে উমাইয়ার মতো গাইরত ও মমতা নিয়ে এ কথা বলার মত কেউ নাই যে, গাযার লোকেরা অভুক্ত থাকবে আর আমরা পেট ভরে খাব, তা হতে পারেনা! ৫৭টি মুসলিম দেশের এমন একজন নেতা কিংবা শাসক নেই যে বলবে, যতদিন পর্যন্ত গাযায় এই নারকীয় হত্যাকান্ড বন্ধ হবে ততদিন পর্যন্ত তোমাদের সাথে সকল সম্পর্ক চ্ছিন্ন করা হবে! 
গাযা আমাদের কালেক্টিভ ক্রাইমের ভিক্টিম। গাযায় যে অপরাধ সংগঠিত হয়েছে পৃথিবী বহুবার ধ্বংস করেও এর প্রায়শ্চিত্ত হবে না। এই অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত থেকে আমাদের মুক্তি নাই। আজীবন আমাদের তাড়িয়ে বেড়াবে এই অনুশোচনা আর অপরাধবোধ! আমাদের আয়েশি জীবন কে ক্রমশ কঠিন করে তুলবে। 
আমরা কি তবে গাযা কে হারিয়ে ফেললাম? হয়তো না। যেই মুহুর্তে গিয়ে আপনার মনে হবে গাযার ইতিহাস এখানেই সমাপ্ত। একে আর বাঁচানো সম্ভব না, ঠিক সেই মুহুর্ত থেকেই গাযা আবার ঘুরে দাঁড়াবে, ঘোষণা করবে নিজের গৌরবময় অস্তিত্ব।  গাযা কে নিশ্চিহ্ন করে ফেলা যায়, তুমুল ধ্বংসের তান্ডব চালিয়ে সবকিছু ভেঙ্গে চুরে তছনছ করে ফেলা যায়, কিন্তু পরাজিত করা যায় না! গাযা হারে না। 
গাযা আসলে কেমন? এই যে যুগ যুগান্তরের রক্ত-প্লাবিত সংগ্রাম, প্রতিরোধের দীপ্ত শপথ নিয়ে মাটি আঁকড়ে বেঁচে থাকা, দ্রোহ ও বিপ্লবের আগুনে তপ্ত ভূমি, এত ধ্বংস ও মৃত্যুর পরও মাথা উঁচু করে টিকে আছে, এর রহস্য কোথায়? আজ থেকে আরও বিশ বছর আগে ফিলিস্তিনের মুক্তি ও সংগ্রামের কবি মাহমুদ দারবিশ তার বিখ্যাত এক কবিতা “গাযার জন্য নীরবতা”য়  এই প্রশ্নের জবাবই দিয়েছিলেন। আপাতত সেই কবিতার কয়েক ছত্র উল্লেখ করাই যথেষ্ট মনে করছি- 
তার কোমরে বেষ্টিত প্রলয়ঙ্কারি বিস্ফোরক…
তুমুল বিস্ফোরণে কেঁপে উঠে সব
এটা না মৃত্যু, না আত্ম-সংহার
বরং জীবনের উপযোগিতা ঘোষণা দেয়ার ক্ষেত্রে
 এই হল গাযার  নিজস্ব নিয়ম
চার বছর হল, গাযার রক্ত মাংস উড়ে যাচ্ছে বোমার আঘাতে
কোন যাদু-মন্ত্র নয়, নয় কোন অলৌকিক কাহিনী
বরং এটিই গাযার একমাত্র অস্ত্র
 টিকে থাকার এবং শত্রুকে পরাস্ত করার
চার বছর হল…শত্রুরা সবখানে তাদের সুখদ স্বপ্নে বিভোর
আমোদিত হচ্ছে সুসময়ের আহ্লাদে… ব্যতিক্রম কেবল গাযাতে
কেননা গাযা তার পরিবার পরিজন থেকে দূরে 
 শত্রুর নিষ্ঠুর থাবার নিচে তার জীবন
যেন এক নিঝুম নিঃসঙ্গ দ্বীপ 
যখনই বিস্ফোরিত হয় বোমার আঘাতে 
কেবল বিস্ফোরণেই থেমে থাকে না
একই সাথে শত্রুর মুখে এঁকে দেয় আঁচড়ের দাগ
ছিন্নভিন্ন করে দেয় তাদের স্বপ্ন, 
সুসময়ের সুখ থেকে বঞ্চিত করে শত্রু কে
কেননা গাযায় সময় এক ভিন্ন জিনিস…
গাযায় সময় বলতে কোন নিরপেক্ষ উপাদান বুঝায় না
যা মানুষ কে ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা ফিকির করার অবকাশ দেয়
বরং এখানে সময় কেবলই বিস্ফোরণের দিকে ঠেলে দেয়
বিপর্যস্ত সত্য কে তুলে ধরে সবার সামনে
এখানে সময় শিশুদের কে ধীর লয়ে শৈশব থেকে প্রৌঢ়ত্বের দিকে নিয়ে যায় না
বরং শত্রুর প্রথম সাক্ষাতেই তাকে পরিণত করে বীর সুপুরুষে
এখানে সময় মানে কোন অবকাশ বা বিশ্রাম নয়
জ্বলন্ত বিকেলের ঝড়, আক্রমণের তুমুল তুফান
এখানে সবকিছুর মূল্যবোধ ভিন্ন…ব্যতিক্রম…সবার চাইতে আলাদা
অবরুদ্ধ ও উপনিবেশিত মানুষের একমাত্র মূল্যবোধ  হল
তার প্রতিরোধের দৈর্ঘ্য ও ব্যাপ্তির পরিমাপ
একমাত্র প্রতিযোগিতাও তাই, প্রতিরোধ। 
গাযা আসক্ত হয়ে পড়েছে এই সুমহান নিষ্ঠুর মূল্যবোধের প্রতি
যে মূল্যবোধ পাওয়া যায়না কোন কিতাবে,গ্রন্থে,বিদ্যালয় বা কোর্সে
মিছিলের শ্লোগান কিংবা সংগীতে
গাযা তা শিখেছে নিজের অভিজ্ঞতায় এবং সেইসব কাজের মাধ্যমে
যা কেবল টিভি সিনেমার দৃশ্যতেই দেখা সম্ভব
গাযা তার অস্ত্র, বিপ্লব ও বাজেট নিয়ে বড়াই করেনা
বরং নিজের তিক্ত মাংস তুলে ধরে শত্রুর কাছে
পরোয়া করেনা কারো, আপন ইচ্ছায় স্বাধীন
রক্ত ঝরানোতেও পিছপা হয়না কোনদিন
গাযা বাকপটু নয়,  নেই তার নিজস্ব কণ্ঠনালি
তার ত্বকের ছিদ্র, পশম কণিকা কথা বলে
 রক্ত, ঘাম ও আগুনের ভাষায়।
একারণেই তার শত্রু তাকে প্রচণ্ড ঘৃণা করে…এমন কি খুনও
অপরাধও তাকে ভয় পায়
ফলত সে চায় গাযা কে সমুদ্রে, মরুভূমিতে কিংবা রক্তের স্রোতে ডুবিয়ে দিতে, 
এ কারণেই গাযার আত্মীয় ও বন্ধুরাও তাকে ভালোবাসে
সলজ্জ এই ভালোবাসা কখনও ভয় কিংবা ঈর্ষাতেও পরিণত হয়
কেননা গাযা হল সেই বন্য বিদ্যালয় এবং জ্বলন্ত উদাহরণ
যা একই সাথে শত্রু ও বন্ধু কে পাঠ দান করে। 
——– 
হয়ত শত্রুরা জয় লাভ করবে গাযায়
কিংবা সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ এসে গ্রাস করে নেবে পুরো ভূখণ্ড
কিংবা তারা উজাড় করে ফেলবে সমস্ত বৃক্ষ ও বাগান
তার হাড়গোড় ভেঙ্গে চুরমার করে ফেলতে পারে
এমনকি নারী ও শিশু রক্তের শিরা,অস্থি ও মজ্জায় ট্যাংকের বহর চালিয়ে দিতে পারে
কিন্তু গাযা কখনও কোন মিথ্যার পুনরাবৃত্তি ঘটাবে না
কোনদিন তার শত্রুকে দেবেনা সম্মতি
বরং বিস্ফোরিত হবে…বোমার আঘাতে ক্ষত বিক্ষত হবে
হতেই থাকবে
এটা না মৃত্যু না আত্ম-সংহার
বরং জীবনের উপযোগিতা ঘোষণা দেয়ার ক্ষেত্রে 
এই হল গাযার নিজস্ব নিয়ম…
( সামতুন মিন আজলি গাযা- মাহমুদ দারবিশ।   সংক্ষেপিত ও পরিমার্জিত)
    

শেয়ার করুন

image_print
Picture of হুজাইফা মাহমুদ
হুজাইফা মাহমুদ
হুযাইফা মাহমুদ, জন্ম হবিগঞ্জ সদরে। দারুল আরকাম বিবাড়িয়া থেকে হিফজ সম্পন্ন করার পর ঢাকার জামিয়াতুল উলুমিল ইসলামিয়ায় অধ্যয়ন করেছেন আট বছর। দারুল উলুম দেওবন্দেও দাওরায়ে হাদীসে অধ্যয়ন করেছেন। দেশে ফিরে হাদীস শাস্ত্র বিষয়ে উচ্চতর পড়াশোনা করেছেন একবছর, দারুল ফিকরে। একটা সময় কবি হিসেবে দুই বাংলায় প্রসিদ্ধ ছিলেন। 'অন্ত:স্থ ছায়ার দিকে' তাঁর প্রথম কবিতার বই। অবশ্য কাব্য চর্চার চেয়ে ইসলাম শরীয়া দেশ সমাজ দর্শন ইতিহাস রাষ্ট্র ও রাজনীতি নিয়ে বিশ্লেষণধর্মি প্রবন্ধ নিবন্ধ লেখার প্রতিই তার বেশি ঝোঁক। অনুবাদ করেছেন কিছু দূর্দান্ত বই। বর্তমানে তিনি ওমান প্রবাসি।
লেখকের অন্যান্য লেখা

সূচিপত্র

সর্বাধিক পঠিত
উত্তম আখলাক: অনন্য ছয়টি মর্যাদা
ক্রোধ সংবরণ: কেন ও কিভাবে
দ্যা ফোরটি রুলস অফ লাভ: সুফিবাদের ইউটোপিয়া
হাদিস শাস্ত্রের প্রাচ্যবাদী বয়ান এবং মুসলিম সমাজে এর প্রভাব
ইয়াহইয়া সিনওয়ার: শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত লড়ে গেছেন যিনি
নারীর জীবনলক্ষ্য ও জীবন পরিকল্পনা